সিলেটে শিক্ষার্থীদের আবাসন সমস্যা প্রকট! পড়ার চেয়ে থাকা খাওয়ার খরচ বেশি – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

সিলেটে শিক্ষার্থীদের আবাসন সমস্যা প্রকট! পড়ার চেয়ে থাকা খাওয়ার খরচ বেশি

প্রকাশিত: ৭:৩৬ পূর্বাহ্ণ, মে ৩১, ২০১৬

সিলেটে শিক্ষার্থীদের আবাসন সমস্যা প্রকট! পড়ার চেয়ে থাকা খাওয়ার খরচ বেশি

Sudent Syl-Pic-17-04-16-2 copyসিলেট নগরে উচ্চশিক্ষা নিতে আসা শিক্ষার্থীদের আবাসন সমস্যা প্রকট। শিক্ষার খরচের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি খরচ হচ্ছে থাকা-খাওয়ার পেছনে। আর মেয়েদের ভাবতে হয় নিরাপদ পরিবেশের কথাও।
নগরে রয়েছে দুটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, চারটি সরকারি কলেজ, অন্তত চারটি বড় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও একটি কলেজ। আশপাশের জেলা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা পড়ছেন এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে হলের কিছু ব্যবস্থা থাকলেও বেসরকারিগুলোতে নেই। শিক্ষার্থীরা বেছে নিচ্ছেন মেস বা হোস্টেল, গুনছেন টাকা।
টিলাগড়, সেনপাড়া, জিন্দাবাজার, শাপলাবাগ, মদিনা মার্কেট, বাগবাড়ী, শিবগঞ্জসহ কিছু এলাকায় শিক্ষার্থীরা হোস্টেল বা মেস ভাড়া নিয়ে থাকছেন। টিলাগড়ে রয়েছে শত বছরের পুরোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমসি কলেজ। এখানকার প্রায় প্রতিটি গলিতেই একাধিক মেস বা হোস্টেল দেখা যায়। একটি গলিতে দেখা গেল, মেয়েদের জন্য আটতলা একটি হোস্টেল তৈরি হচ্ছে। কলেজটির প্রথম বর্ষের ছাত্রী শামসুন্নাহার বিথী টিলাগড়েরই একটি হোস্টেলে থাকেন। তিনি বলেন, তাঁর হোস্টেলে একেকটি ফ্ল্যাটে ১৪ থেকে ১৭ জন মেয়ে থাকেন। তাঁদের প্রত্যেকের থাকা-খাওয়া বাবদ মাসে অন্তত তিন হাজার টাকা খরচ হয়।
আরেকটি হোস্টেলের এক ছাত্রী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘সন্ধ্যার পর যদি কোনো টিউশনি পাই, সেটা করতে পারি না। কারণ, আজানের সঙ্গে সঙ্গে হোস্টেলে ঢুকতে হয়। রাত করে আসাটা সবাই ভালোভাবে নেয় না।’ এ ছাড়া হোস্টেলের সামনের একটি দোকানে ছেলেদের আড্ডা খুব বেশি। নানা রকম মন্তব্যও শুনতে হয় বলে জানালেন ওই শিক্ষার্থী। এমসি কলেজে ছেলেদের একমাত্র হলটি ২০১২ সালে ছাত্রলীগ ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে এক সংঘর্ষে পুড়ে যায়। উপাধ্যক্ষ মো. হায়াতুল ইসলাম আকঞ্জি বলেন, গ্যাস-সংযোগ পেলে সেটি চালু হবে, সেখানে ২৫০ জন ছাত্রের থাকার ব্যবস্থা হবে। তিনি আরও বলেন, ছাত্রছাত্রীদের জন্য আলাদা দুটি নতুন হল তৈরি হচ্ছে। সেগুলোর প্রতিটিতে ১০০ জন থাকতে পারবে।
শহরের আরেকটি প্রধান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মদনমোহন কলেজে প্রায় সাড়ে ১০ হাজার শিক্ষার্থী রয়েছেন। এঁদের মধ্যে সাড়ে তিন হাজার ছাত্রী। ছেলেমেয়ে কারও জন্যই কোনো হল নেই। মাস্টার্স ফাইনাল পরীক্ষার্থী পপি বৈদ্য বলেন, থাকা-খাওয়াসহ তাঁকে প্রতি মাসে প্রায় পাঁচ হাজার টাকা দিতে হয়। তাঁর দুই মাসের খরচে সারা বছরের টিউশন ফি হয়ে যায়। তিনি আরও বলেন, কলেজের নিজস্ব হল থাকলে খরচ অনেক কমে যেত। মদনমোহন কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক আবুল ফতেহ ফাত্তাহ বলেন, সবকিছু নির্ভর করছে প্রাতিষ্ঠানিক সংগতির ওপর।
শহর থেকে একটু দূরে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। এখানে প্রায় ১০ হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। মেয়েদের দুটি হলে আসনসংখ্যা ১ হাজার ৭২ এবং ছেলেদের তিনটিতে আসনসংখ্যা ১ হাজার ৫২। হলগুলোর শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আসনের চেয়ে অনেক বেশিসংখ্যক ছাত্রছাত্রী থাকছেন। মেয়েদের হলে ভাড়া বছরে ২ হাজার ৭০০ টাকা। এ হল দুটির অধীনে ক্যাম্পাসের বাইরে আরও তিনটি ভবনে থাকার ব্যবস্থা আছে। তবে সেগুলোতে আসনপ্রতি শুধু থাকার ভাড়া মাসে ১ হাজার ৫৫০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা। সেখানকার একজন ছাত্রী বললেন, ‘আমাদের হয় বাইরে খেতে হচ্ছে, নয়তো চুলায় সিরিয়াল ধরে রান্না করতে হচ্ছে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যক্ষ মো. আমিনুল হক ভুঁইয়া বলেন, ‘১ হাজার ২০০ ছাত্রীর আবাসনের জন্য ১০তলা একটি ভবনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে এবং ছেলেদের জন্য সৈয়দ মুজতবা আলী হলটিও সম্প্রসারণ করা হবে।’
সিলেট সরকারি মহিলা কলেজে ছাত্রী আছেন ৮ হাজার ২০০ এবং হল আছে একটি। সেখানে আসনসংখ্যার চেয়ে দেড় গুণ বেশি ছাত্রী থাকেন। হলের প্রভোস্ট সহযোগী অধ্যাপক জামালুর রহমান বলেন, ‘প্রচুর আবেদন জমা পড়লেও সবাইকে সিট দিতে পারি না।’
অন্যদিকে, সম্পূর্ণ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হলেও সীমিত আবাসন ব্যবস্থা নিয়ে চলছে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। একটি সিটের বিপরীতে শিক্ষার্থী রয়েছেন সাড়ে তিনজন। প্রতিবছর ৪২০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ছাত্র বলেন, ‘আমরা যারা বাইরে থাকি তাদের জন্য গ্রুপওয়ার্ক করতে সমস্যা হয়, কোনো পড়া না বুঝলে তাৎক্ষণিক সাহায্যও পাই না।’
একদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অপর্যাপ্ত আবাসন ব্যবস্থা, অন্যদিকে মালিকপক্ষের বেশি ভাড়া আদায়। সব মিলিয়ে সিলেটে পড়তে আসা শিক্ষার্থীদের মাস শেষে মেলাতে হয় টাকার হিসাব। শিক্ষার খরচ যতটুকু, থাকা-খাওয়ার খরচ তার চেয়ে অনেক বেশি এবং তা বেড়েই চলছে।