সিলেট আওয়ামী লীগে চ্যালেঞ্জের মুখে শফিক চৌধুরী – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

সিলেট আওয়ামী লীগে চ্যালেঞ্জের মুখে শফিক চৌধুরী

প্রকাশিত: ২:৪৫ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৬, ২০১৯

সিলেট আওয়ামী লীগে চ্যালেঞ্জের মুখে শফিক চৌধুরী

‘হার্মফুল’ নয় শফিকুর রহমান চৌধুরী। বলা হয়ে থাকে চব্বিশ ঘণ্টার রাজনীতিবিদ। প্রকাশ্যে কারো সঙ্গে কোনো বিরোধিতা নেই। এরপরও কোথায় যেন ‘ঘাটতি’ তার। প্রতিপক্ষ তৈরি হয়ে যায়। কখনো কখনো তৈরিও করা হয়। নিজ এলাকা বিশ্বনাথ ও ওসমানীনগরে তো গলদঘর্ম অবস্থা। যুক্তরাজ্যের এক সময়ের রাজনৈতিক সহযোগী আনোয়ারুজ্জামান তার পথকে বিশৃঙ্খল করে দিয়েছেন। এলাকায় ফ্যাক্টরও আনোয়ারুজ্জামান।

সিলেটে তৈরি হয়েছে তার প্রতিপক্ষ। ধীরে ধীরে কঠিন পথে পা দিচ্ছেন তিনি। সামনেই তার অগ্নিপরীক্ষা। জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন। আগামী কমিটিতে তিনি সভাপতি কিংবা সাধারণ সম্পাদক দু’জায়গাতেই মানানসই। এরপরও তার পিছু ছাড়ছে না প্রতিপক্ষরা। তার বিরোধী বলয়ও ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে। এই অবস্থায় সিলেট আওয়ামী লীগের আগামীর নেতৃত্ব নিয়ে শফিকুর রহমান চৌধুরীর অবস্থান দোদুল্যমান হয়ে পড়েছেন। জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি পদকে ঘিরে তার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামতে পারেন মন্ত্রী কিংবা এমপিদের মধ্য থেকে কেউ। এমন আভাস ইতিমধ্যে সিলেট আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে মিলেছে। চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনাও। জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হতে শফিকুর রহমান চৌধুরীর পক্ষে তার সমর্থকরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। সিলেটের আওয়ামী ঘরানার রাজনীতিতে শফিকুর রহমান চৌধুরীর পদচারণা সেই ছাত্র জমানা থেকে। দীর্ঘদিন তিনি সিলেটে ছাত্র রাজনীতি করেছেন। এরপর চলে যান লন্ডনে।

সেখানেও আওয়ামী লীগের রাজনীতির শীর্ষ নেতাদের একজন হয়ে ওঠেন। তখন শফিকুর রহমান চৌধুরী ছিলেন যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক। নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনীতির মাধ্যমে পা মাড়ান সিলেট-২ আসনে। সবাই তাকে সাদরে গ্রহণ করে নেন। আর ২০০৮ সালে নির্বাচন করে তিনি পরাজিত করেন বিএনপি’র তুখোড় নেতা এম. ইলিয়াস আলীকে। এক চমকেই সিলেটে বাজিমাত করেন শফিকুর রহমান চৌধুরী। আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তার। এমপি হওয়ার পর পথ খুঁজেন সিলেট আওয়ামী লীগে কর্তৃত্ব নেয়ার। সেই সুযোগও এসে যায়। জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন সিলেট আওয়ামী লীগের তখনকার পরিচিত ও প্রভাবশালী নেতা ইফতেখার হোসেন শামীম। আবদুুস সামাদ আজাদ বলয়ের শীর্ষ নেতা হওয়ায় আওয়ামী লীগে শক্তিশালী অবস্থান ছিলেন প্রয়াত নেতা শামীম। তাকে ঘিরেই আবর্তিত হতো সিলেট আওয়ামী লীগের রাজনীতি। প্রশাসনেও ছিলো আধিপত্য। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতার আসার পর সিলেট আওয়ামী লীগের সম্মেলন হয়। সেই সম্মেলনে শামীমকে সরিয়ে সাধারণ সম্পাদক করা হয় শফিকুর রহমান চৌধুরীকে। তুমুল আলোচনা, বিদ্রোহ দেখা দেয় জেলা আওয়ামী লীগে। শামীমের পক্ষে সিলেট আওয়ামী লীগের একাংশ মাঠের আন্দোলনে নামে। একযোগে পদত্যাগেরও ঘোষণা দেয়। কিন্তু কাজ হয়নি। ২০১২ সালের ১১ই মে শামীম মারা যান। এরপর তার স্থলে এসে হাল ধরলেন শফিকুর রহমান চৌধুরী।

দু’জনের বাড়িই এক জায়গায়। সিলেটের বিশ্বনাথে। ওই সময় থেকেই বিশ্বনাথ আওয়ামী লীগের একাংশ শফিকুর রহমান চৌধুরীকে মনেপ্রাণে মেনে নেয়নি। এখনো তারা বিশ্বনাথে শফিকবিরোধী। সিলেটের রাজনীতিতেও প্রকাশ্য কোনো গ্রুপ তৈরি করেননি শফিকুর রহমান চৌধুরী। সবার সঙ্গে মিলেমিশে তিনি রাজনীতি চালাচ্ছেন। সুখে, দুঃখে ছুটে যাচ্ছেন। কিন্তু সাংগঠনিকভাবে তিনি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেননি। তার নেতৃত্বে সিলেট-২ আসনে স্থানীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা ভোটারের জন সমর্থন পাননি। একই অবস্থা বিরাজ করে গোটা জেলাও। বিভিন্ন উপজেলা কমিটি সাজানো, নির্বাচনে একক প্রার্থী দেয়া সহ নানা বিষয়ে তিনি তৃণমূলের আস্থা অর্জন করতে পারেননি। এজন্য সিলেটে কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে সিলেট আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায় বিশৃঙ্খলা হয়েছে। শফিক চৌধুরীর এলাকা বিশ্বনাথের সাংগঠনিক রিপোর্ট প্রদানকে কেন্দ্র করে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক দু’জনই মাইক নিয়ে টানাটানি করেন। এছাড়া আরো কয়েকটি উপজেলায়ও একই ধরনের ঘটনা ঘটে। কেন্দ্রীয় নেতারা উপজেলা নেতাদের সাংগঠনিক রিপোর্টের দৈন্যদশা নিয়ে ক্ষোভ ঝাড়েন। দীর্ঘ নেতৃত্বের কারণে শফিকুর রহমান চৌধুরী এখন সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা। একক নেতা হিসেবে বলেন অনেকেই। তার সঙ্গে সভাপতি হিসেবে আছেন একই সংসদীয় আসনের সন্তান ও জেলা পরিষদের প্রশাসক এডভোকেট লুৎফুর রহমান। জেলা পরিষদ নির্বাচনের সময় এডভোকেট লুৎফুর রহমানের বিরোধী বলয়ে ছিল তার অবস্থান। ওই সময় তাদের দু’জনের মধ্যে দ্বন্দ্ব প্রকাশ্য হলে পরবর্তীতে তারা দু’জনই বিষয়টি নিয়ে বাড়াবাড়ি করেননি।

এখন যৌথভাবেই চালাচ্ছেন কর্মকাণ্ড। সম্প্রতি সিলেটে শফিকুর রহমান চৌধুরীকে নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। সিলেটে অনুষ্টিতব্য ‘রবীন্দ্রনাথ জন্মশত স্মরণোৎসব’ ঘিরে আওয়ামী লীগ দ্বিধাবিভক্ত। যেহেতু প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে আসতে পারেন সে কারণে আওয়ামী লীগের একাংশ এই আয়োজনের সদস্যসচিব হিসেবে বিএনপি দলীয় মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীকে মানছে না। শফিকুর রহমান চৌধুরী এই অবস্থায় কোনো অংশে হেলে পড়েননি। দু’পক্ষের কাছে তিনি সমান। এ নিয়ে দেখা দিয়েছে ক্ষোভ। অবস্থান নিয়েও দেখা দিয়েছে প্রশ্ন। তবে- বুধবার রাতে স্মরণোৎসবের নির্বাহী কমিটির সভায় তিনি অংশ নেননি। সামনেই জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন। এবার সাধারণ সম্পাদক পদে নতুনদের চোখ। সাবেক ছাত্রনেতারা এই পদের জন্য শক্ত লবিং চালাচ্ছেন। ফলে সভাপতি পদেই শফিকুর রহমান চৌধুরী নাম উচ্চারিত হতে শুরু করেছে। কিন্তু এই পদে তার বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে যাচ্ছেন সিলেট-৩ আসনের এমপি মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী ও বর্তমান সহ-সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা মাসুক উদ্দিন আহমদ আহমদ ও সিলেটের মন্ত্রী পরিবারের ঘনিষ্ঠজন ড. আহমদ কবির। আওয়ামী লীগের নেতারা জানিয়েছেন- জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনকে নিয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে যাচ্ছেন শফিকুর রহমান চৌধুরী। তার আগে বাকি থাকা উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন করে দলের অভ্যন্তরে শৃঙ্খলা ফেরাতে হবে। একক ভাবে তাকে এ পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে হবে। এক্ষেত্রে তার বিরোধীরাও সরব থাকবে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

ফেসবুকে সিলেটের দিনকাল