সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ হচ্ছে – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ হচ্ছে

প্রকাশিত: ১০:৩৭ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১৬, ২০১৯

সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ হচ্ছে

আহমদ মারুফ
বহুল প্রত্যাশিত ‘সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ’ অবশেষে হচ্ছে। অচিরেই এই মহাপরিকল্পনা প্রণীত হবে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আবদুল মোমেন।
তিনি বলেন, ‘দেশের সবগুলো বড় শহরে উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ রয়েছে। খুলনা ও রাজশাহীতে উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ থাকলেও সিলেটে নেই। শহর বড় হলে এ দাবি আরও জোরালো হবে।’
শনিবার জেলা প্রশাসনের সম্মেলন কক্ষে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের আয়তন সম্প্রসারণ বিষয়ক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা বলেন। সিটি কর্পোরেশন ও জেলা প্রশাসনকে পৃথক প্রস্তাবনা তৈরির নির্দেশও দেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
সুপ্রাচীন সিলেট পৌরসভা সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত হওয়ার দুইযুগ কেটে গেছে। সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে সিলেট এখন একটি ব্যস্ত মহানগরী। দ্রুতই বাড়ছে এই নগরীর পরিধি। সেই সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মানুষ। পর পর তিনটি সরকারের প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও ‘সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ’ গঠন না হওয়ায় ব্যাহত হচ্ছে সিলেটের পরিকল্পিত উন্নয়ন। জানা যায়, ১৯৮৯ সালে সিলেট শাহী ঈদগাহ মাঠে এক জনসভায় বক্তৃতাকালে সাবেক রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদ সিলেটবাসীর দাবির প্রেক্ষিতে সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনের ঘোষণা দেন। ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত এরশাদ ক্ষমতায় থাকলেও এরশাদ এ প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন করেননি। ১৯৯১ সালে নির্বাচনী প্রচারণার সময় সিলেটÑ১ (সদর উত্তর ও কোম্পানীগঞ্জ) আসনের বিএনপি প্রার্থী খন্দকার আব্দুল মালিক ক্ষমতায় গেলে সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনের প্রতিশ্রুতি দেন। ১৯৯১ সালে সরকার গঠন করে বিএনপি ৫ বছর ক্ষমতায় থাকলেও দাবিটি বাস্তবায়ন করেনি। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনী প্রচারণার সময় এই ইস্যুটিকে ট্রাম্পকার্ড হিসাবে ব্যবহার করেন ওই আসনের আওয়ামী লীগ প্রার্থী হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী। নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর তিনি জাতীয় সংসদের স্পিকার মনোনিত হন। এরপর এটি আর বেশিদূর এগোয়নি। ক্ষমতার শেষলগ্নে ২০০১ সালের ২৯ জানুয়ারি মন্ত্রীসভার নিয়মিত বৈঠকে ‘সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ’ গঠনের প্রস্তাব অনুমোদিত হয়। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি তথা চারদলীয় জোট প্রার্থী হিসাবে এম. সাইফুর রহমান সিলেট-১ আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। নির্বাচনী প্রচারাভিযানের সময় তিনিও সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ঘোষণা দিয়েছিলেন। চার দল সরকার গঠন করলে এম. সাইফুর রহমান অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী নিযুক্ত হন। সিলেটে বিভিন্ন সভা-সমাবেশে বক্তৃতাকালে অর্থমন্ত্রীকে প্রায়শ সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের স্বপক্ষে বক্তৃতা দিতে দেখা যায়। কিন্তু বাস্তবতা দৃশ্যমান হয়নি।
ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ও রাজশাহী মহানগরীতে উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ রয়েছে। এই কর্তৃপক্ষ উন্নয়ন ছাড়াও পরিকল্পিত নগরায়নে ভূমিকা পালন করে আসছে। সিলেট, রংপুর ও বরিশালে উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ না থাকায় বিভাগে উন্নীত হওয়ায় এসব জায়গায় তিনটি পৃথক উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন করা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
দেশের উত্তর-পূর্ব প্রান্তের সমৃদ্ধ জনপদ সিলেট। এখানে একদিকে যেমন আছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যরে অবারিত আকর্ষণ, অপরদিকে অর্থনৈতিকভাবে অমিত সম্ভাবনাময়। সুযোগ-সুবিধা রয়েছে সব ধরনের। কেবল প্রয়োজন উদ্যোগ আর পৃষ্ঠপোষকতা। কিন্তু তা না হওয়ায় সিলেট অর্থনৈতিকভাবে তেমন অগ্রগতি লাভ করতে পারে পারেনি। সিলেটে শিল্পখাতে উল্লেখ করার মতো কোনো উন্নয়ন নেই। ফলে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে এখনো পিছিয়ে আছে।
সিলেটের শিক্ষা-স্বাস্থ্য, কৃষি, শিল্প-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সরকারিভাবে কার্যকর তেমন কোনো উদ্যোগ এখনো নেওয়া হয়নি। সুষ্ঠু নীতিমালা ও সরকারের সহযোগিতার অভাবে সিলেটের প্রবাসীরা উৎপাদনশীল খাতে তাদের অর্থ বিনিয়োগ করতে পারছেন না। সিলেটে অবস্থিত সবকটি ব্যাংকের শাখা-প্রশাখাগুলো টাকার পাহাড় হয়ে যাচ্ছে। প্রবাসীদের প্রেরিত হাজার হাজার কোটি টাকা জমা হলেও সিলেটের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও শিল্পায়নে ১০ ভাগ টাকাও বিনিয়োগ হয়নি। যথাযথ উদ্যোগ, ব্যবস্থাপনা ও পুঁজি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার অভাব থাকায় প্রবাসীরা সিলেটে বিনিয়োগ করতে দিন দিন আগ্রহ হারাচ্ছেন। আর দুর্ভাগ্যজনকভাবে সিলেটে প্রবাসীদের বিশাল অংকের টাকা ব্যয়ে নির্মিত হচ্ছে শত কোটি টাকায় মার্কেট, বিপণী বিতান। আবাদযোগ্য ৩ লাখ ৮১ হাজার হেক্টর জমি অনাবাদীই রয়ে গেছে।
সম্ভাবনাময় পযর্টন শিল্প চরম অবহেলার শিকার। সরকারিভাবে সিলেটের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে কাজে লাগিয়ে দেশের পর্যটন শিল্পের বিকাশে এখনও কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। নয়নাভিরাম জাফলং ও দেশের একমাত্র জলপ্রপাত মাধবকু- চরম অব্যবস্থাপনার কারণে পর্যটকদের আকর্ষণ হারাচ্ছে দিন দিন।
হাওর উন্নয়নে বোর্ড করা হলেও এর কোনো সুফল বৃহত্তর সিলেটসহ হাওর এলাকার মানুষ দেখছে না। তবে ড. ফখরুদ্দীন আহমদের তত্ত্বাবধায়ক সরকার সিলেটে উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক করে সিলেটের উন্নয়নে বেশকিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তবে এগুলো সিদ্ধান্তের বৃত্তেই বন্দি রয়েছে।
অপরিকল্পিত নগরায়ন বন্ধ ও বিদ্যমান নানা সমস্যা সমাধান করে সিলেটকে একটি আদর্শ মহানগরীতে পরিণত করার জন্য সিলেটবাসীর প্রাণের দাবি মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন। অবশেষে এ লক্ষ্যকে সামনে রেখে কাজ শুরু করেছে কর্তৃপক্ষ।
সিলেট নগরীকে মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য নগর উন্নয়ন অধিদপ্তর শেলটেককে দায়িত্ব দিয়েছে। মহাপরিকল্পনায় নগরীর বর্তমান ও ভবিষ্যত কাঠামো নির্ধারণ, জনবসতিকে সুবিন্যস্ত করে নগরীর সম্প্রসারণকে কাঙ্খিত পর্যায়ে রাখা, বর্তমান সমস্যা চিহ্নিত ও তা সমাধানের উপায় নির্ধারণ, জমির সর্বোচ্চ পরিকল্পিত ব্যবহার নিশ্চিত, ভবিষ্যত উন্নয়নের দিক-নির্দেশনা ও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়ণের সুপারিশ থাকবে মহাপরিকল্পনায়।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

ফেসবুকে সিলেটের দিনকাল