সিলেট পলিটেকনিকে ‘টর্চার সেল’ – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

সিলেট পলিটেকনিকে ‘টর্চার সেল’

প্রকাশিত: ১১:২৫ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ৪, ২০১৯

সিলেট পলিটেকনিকে ‘টর্চার সেল’

বিধান সাহার নাম ভাঙ্গিয়ে চাঁদাবাজী-নির্যাতন

নিজস্ব প্রতিবেদক
বুয়েটর পর আরেকটি টর্চার সেলের সন্ধান পাওয়া গেছে সিলেট পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট-এ। শিক্ষার্থী ছাড়াও শিক্ষক নির্যাতনের ঘটনাও বেরিয়ে আসছে। তবে মুখ খুলতে নারাজ তারা। সম্প্রতি কয়েকটি ঘটনার সিসি টিভি ক্যামেরার ফুটেজে বেরিয়ে আসে এমন চিত্র। প্রকাশ্যে দেশীয় অস্ত্র প্রদর্শন করে ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের ভয়ভীতি ও সাংবাদিকের উপর হামলার দৃশ্য।
সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও মহানগর আওয়ামী লীগের উপ-সম্পাদক বিধান কুমার সাহার নাম ভাঙ্গিয়ে ছাত্রলীগ নেতা সৈকত চন্দ্র রিমি ও তাওহীদ হাসান নেতৃত্বে চলছে এই চাঁদাবাজি ও নিপীড়ন।
সম্প্রতি বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনা ও সেখানকার ‘টর্চার সেলে’ সাধারণ শিক্ষার্থীদের নির্যাতনের বিষয়টি সামনে আসার পর গত বুধবার গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে সারা দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আবাসিক হলগুলো তল্লাশির নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী দৃঢ়কন্ঠে আরও বলেন, ‘কোথায় কী আছে না আছে খুঁজে বের করতে হবে। এ ধরনের কারা মাস্তানি করে বেড়ায়, কারা এ ধরনের ঘটনা ঘটায় সেটা দেখতে হবে।’
প্রধানমন্ত্রীর এমন দৃপ্ত উচ্চারণের পর সিলেট পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটে চলছে শিক্ষক-শিক্ষার্থী নির্যাতণের নির্মম চিত্র।
অসুন্ধানে জানা গেছে, সুরমা হোস্টেলে বসবাসকারী ছাত্রলীগ কর্মীদের তান্ডব লীলায় অতিষ্ঠ সাধারণ শিক্ষার্থীরা। ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের রয়েছে ২টি টর্চার সেল একটি প্রকাশ্যে আরেকটি সুরমা হোস্টেলের ভিতরে রিমি ও তওহিদের রুমে। সাধারণ ছাত্রদের কাছে চাঁদা চাইলে দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে তাদের বিভিন্ন কৌশলে হোস্টেলে নিয়ে কমর থেকে বেল্ট খুলে পাশবিক নির্যাতন চালানো হয়।
আরেকটি টর্চার সেল রয়েছে ইন্সটিটিউটে প্রবেশ করলে দেখা যাবে গেইটের ডান পাশে ইন্সটিটিউটের মূল বিল্ডিংয়ের পেছনে চেয়ার নিয়ে বসে আছেন ক্যাম্পাস শিক্ষার্থীরা। সেখানে ডেকে নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের হয়রানী করে ছাত্রলীগ। তাদের বিরুদ্ধে কথা বলে স্থানীয় প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতাদের ব্যবহার করে আইশৃঙ্খলাবাহিনী দিয়ে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করে থাকেন। গত ৩ জুলাই সিলেট পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ছাত্র রায়হান ইসলাম দীপুর উপর হামলা চালায় ইনস্টিটিউটের সুরমা আবাসিক হোস্টেল বসবাসকারী ছাত্রলীগ নেতা আরিফ, নয়ন, সম্রাট, বাঁধন, বক্করসহ অজ্ঞাত ১৫-২০ কলেজ ছাত্রলীগ নেতা। এসময় রাস্তা দিয়ে অফিসে আসার সময় দীপু চোখ দিয়ে রক্ত বের হতে দেখে এগিয়ে গেলে সাংবাদিক নুরুল ইসলাম ও মো. নাঈমুল ইসলামের উপর দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা চালায় ইনস্টিটিউট ছাত্রলীগের নেতাকর্মী। এ ঘটনায় সাংবাদিক নুরুল ইসলাম বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেন যার নং- (০২. ০৩/০৭/১৯ইং)। মামলা দায়েরের প্রায় ৩ মাস অতিবাহিত হওয়ার পরও কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারে নি পুলিশ। বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বার বার প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছাড়াও শিক্ষামন্ত্রীর কাছে সিলেটের জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রতিকার চেয়ে আবেদন করেন স্থানীয়রা। বিষয়টি ভিন্ন ভাবে প্রবাহিত করতে হামলা প্রায় ১৫ দিন পর আদালতের মাধ্যমে সাংবাদিক নুরুল ইসলামের পরিবারকে হয়রানি করতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও জননেত্রী শেখ হাসিনার ছবি অবমাননা দায়ের একটি মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে পার পেতে চায় হামলাকারীরা। অথচ অবাক করার বিষয় অভিযোগ দাখিলকারী নুরুল ইসলামের মামলার প্রধান আসামী। ইন্সটিটিউট ছাত্রলীগ নিজেরদের অপরাধ ডাকতে ঢাল হিসেবে জাতির জনক ও তার কন্যাকে ব্যবহার করছেন। এধরনের নির্যাতন নিপীড়ন নতুন নয়। প্রায় এধরনের নির্যাতন-নিপীড়ন চালানো হয় সাধারণ শিক্ষার্থীদের উপর। ঐতিহ্যবাহি এই প্রতিষ্ঠান এখন মাদক বিক্রেতা, মাদক সেবি ও অস্ত্রবাজদের আস্তানায় পরিণত হয়েছে। নামধারী কিছু ছাত্রলীগ নেতার ছত্রছায়ায় ইন্সিটিটিউটের কিছু শিক্ষার্থী সুরমা হোস্টেলে বসবাস করে প্রকাশ্যে শিক্ষক ও স্থানীয় প্রশাসন এবং স্থানীয় কিছু লোভী প্রভাবশালীদের সহযোগিতায় চালিয়ে যাচ্ছে ফেন্সিডিল, ইয়াবা, গাঁজা ও দেশীয় মদের ব্যবসা। তাদের বিরুদ্ধে স্থানীয় কেউ কথা বললে তারা তাদের অস্ত্রের আস্তানা সুরমা হোস্টেল ও ক্যাম্পাসের মোড়ে মোড়ে থাকা দেশীয় অস্ত্র দিয়ে তাদের উপর হামলা চালায়। ইন্সিটিটিউটে প্রবেশ করলে বুঝতে পারবেন কিভাবে ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের মাদকাসক্ত করা হচ্ছে। সাধারণ শিক্ষার্থী প্রতিবাদ করলে তারা তাকে তোলে নিয়ে মানসিক নির্যাতন ও মারধর করে যা অতীতে দক্ষিণ সুরমা থানা পুলিশের উপস্থিতিতে সমাধান করা হয়েছে অধ্যক্ষের কার্যালয়ে বসে। এসময় পুলিশ প্রশাসনের আচরণ দেখলে মনে হয় তারা তাদের নিরাপত্তারক্ষীবাহিনী। তাদের অনেক অপকর্মের কথা জানলেও চাকরির যাওয়ার ভয়ে বলতে পারেন না ইন্সিটিটিউটের শিক্ষকরা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক শিক্ষক বলেন, যদি কোনো শিক্ষকের সামনে অগ্নি অস্ত্র রেখে কোনো শিক্ষার্থী অযৌক্তিক দাবি করে তাহলে ওই শিক্ষক প্রাণের ভয়ে সে যা বলবে শিক্ষক তা করবেন। উদাহরণ দিতে গিয়ে ওই শিক্ষক জানান, এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সাথে আলাপ করে কোনো লাভ হয়নি। সমগ্র বাংলাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের হোস্টেল পরিচালনা করার নিয়ম হচ্ছে হোস্টেল সুপারের মাধ্যমে নিয়মতান্ত্রিকভাবে অফিস করবেন এবং তার মাধ্যমে হোস্টেলের সকল কার্যক্রম চলবে। অথচ এখানে ব্যতিক্রম নেই কোনো হোস্টেল সুপার এমনকি কোনো শিক্ষক সুরমা হোস্টেলে প্রবেশেও অনুমতি নেই। শিক্ষকদের সাথে সুরমা হোস্টেলের শিক্ষার্থীদের আচরণে মনে হবে শিক্ষার্থীরা প্রতিষ্ঠান চালায় আর তাদের হাতের পুতুল হচ্ছেন অধ্যক্ষ থেকে শুরু করে প্রতিষ্ঠানের বাকি শিক্ষকরা।
দক্ষিণ সুরমা থানায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ইন্সটিটিউটের সাধারণ শিক্ষার্থীরা জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে সাধারণ ডায়েরী করেন। এই সুরমা হোস্টেলের নামধারী ছাত্রলীগ নেতাদের ভয়ে নিরাপত্তাহীনতায় পড়াশুনা করছেন তারা। ভয় যেন সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিত্যসঙ্গী। বাবা-মা ও পরিবার অনেক স্বপ্ন নিয়ে উচ্চ শিক্ষা অর্জনের জন্য পাঠিয়েছেন সিলেট পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটে। তাদের ছেলে পড়াশুনা করে ইঞ্জিনিয়ার হবে কিন্তু এখানে এসে মা-বাবা ও পরিবারের কথা ভুলে জড়িয়ে পড়ে নানা অপরাধে। ইন্সটিটিউটের সুরমা হোস্টেলের শিক্ষার্থীরা জোরপূর্বকভাবে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মাদকাসক্ত হতে বাধ্য করছেন। শুধু এর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ইন্সটিটিউিটের অধ্যক্ষ ড. আব্দুল্লাহ ভয়ভীতি দেখিয়ে বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে চাঁদা উত্তোলন করছেন। যা পরে ২ ভাগে ভাগ করে নেওয়া হয়। বিগত কয়েকদিন আগে রাতের আধারে ইন্সিটিটিউটের পুকুরের মাছ বিক্রয় করে টাকা ভাগ করে নেন হোস্টেলের শিক্ষার্থী ও অধ্যক্ষ। আর সুরমা হোস্টেলের উন্নতিকরণের কথা বলে বার বার টাকা আত্মসাৎ করছেন রিমি ও তওহিদ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কলেজের একজন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী জানান, শুধু কাগজপত্রে হোস্টেল সুপারের দায়িত্বে সরোজ কুমার হাওলাদার ও সহকারী সুপার এনামূল হকের নাম আছে কিন্তু কাজে নেই। তালিকভূক্তি ছাড়া প্রায় ২৫০ জন শিক্ষার্থী এখানে বসবাস করে আসছেন। হোস্টেলে বসবাসকারী শিক্ষার্থীদের নিয়মে জোরপূর্বকভাবে চলছে সুরমা ছাত্রবাস। এই বিষয়ে আলাপ করতে হোস্টেল সুপার সরোজ কুমার হাওলাদারের ব্যবহৃত মুঠোফোনে বারবার ফোন দেওয়া হলে তিনি রিসিভ করেননি। বিষয়টি নিয়ে আলাপ করতে ইন্সিটিটিউটের অধ্যক্ষ ড. আব্দুল্লাহকে বার বার ফোন দেওয়া হলে তিনিও ফোন রিসিভ করেন নি।
অভিযোগ প্রসঙ্গে সৈকত চন্দ্র রিমি ও তাওহীদ হাসানের মুঠোফোনে বার বার যোগাযোগ করা হলে মোবাইল রিসিভ করেন নি তারা।
এ প্রসঙ্গে মহানগর আওয়ামী লীগের উপ-সম্পাদক বিধান কুমার সাহার সাথে আলাপকালে তিনি জানান, ‘আমি ছাত্রলীগেই নেই অথচ আমার নাম ভাঙ্গিয়ে চাঁদাবাজি হচ্ছে, এখন আমি কী বলবো…’।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

ফেসবুকে সিলেটের দিনকাল