রিমি-তৌহিদ টেন্ডার ও চাঁদাবাজি – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

রিমি-তৌহিদ টেন্ডার ও চাঁদাবাজি

প্রকাশিত: ১০:০৯ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১৯, ২০২০

রিমি-তৌহিদ টেন্ডার ও চাঁদাবাজি

নিজস্ব প্রতিবেদক

  • ভয়ে প্রতিষ্ঠার ছাড়া অধ্যক্ষ

  • বাহিনী দিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নির্যাতন

  • ‘নামধারী টেন্ডারবাজ ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে’

সিলেট পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট একটি ইতিহাস। যেখান শিক্ষা জীবন শেষ করে প্রকৌশলী হয়ে দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখছেন তারা। বর্তমান সময় এই প্রতিষ্ঠানের অবস্থা এতই নাজুক যা ভাষায় প্রকাশ করার মত নয়। অস্বাভাবিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে শিক্ষা অর্জন করতে হচ্ছে সিলেট পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটে পড়তে আসা সাধারণ শিক্ষার্থীদের। প্রতিষ্ঠানে স্বাভাবিক পরিস্থিতিকে অস্বাভাবিক করে রেখেছে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। তাদের মদদ দাতা এই প্রতিষ্ঠানের সাবেক শিক্ষার্থী সৈকত চন্দ্র রিমি ও তৌহিদ হাসান।

রিমি ও তৌহিদ প্রতিষ্ঠানের আবাসিক সুরমা হোস্টেলে জোরপূর্বেক বসবাস করে আসছেন। প্রতিষ্ঠানে অধ্যক্ষ থেকে শুরু করে শিক্ষার্থীরা তাদের কাছে বার বার নির্যাতনে শিকার হচ্ছেন। এই নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পরও টনক নড়ছে না সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষের। তাদের ভয়ে প্রতিষ্ঠান ছাড়া অধ্যক্ষ। তারা ভয় দেখিয়ে চাঁদা নেয়া থেকে শুরু করে অনেকভাবে সাধারণ শিক্ষার্থীদেরকে হেনস্তা করে। স্টাইপেন, ট্রান্সফার, রেগুলার, এডমিট কার্ড বিভিন্ন খাতে জোর করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ভয় দেখিয়ে চাঁদাবাজি করছে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। টেন্ডার বাজি থেকে শুরু করে সকল ধরনের অপকর্মে লিপ্ত রিমি ও তৌহিদ বাহিনী।

তারা নবাগত শিক্ষার্থীদের দিয়ে অপমান করাচ্ছে অধ্যক্ষ ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের। রিমি ও তৌহিদের মদদ দাতা মহানগর আওয়ামী লীগের উপ-সম্পাদক বিধান কুমার সাহা। বিগত কয়েকদিন পূর্বে প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে ১০টি টেন্ডার দেওয়া হয়। সেই টেন্ডার নিয়মতান্ত্রীক ভাবে জমা প্রদান করেন ঠিকাদাররা। সেখানে টেন্ডার জমা প্রদান করেন রিমি ও তৌহিদরাও। ১০টি কাজের মধ্যে দুটি কাজ ২টি কাজ পান ইকবাল কামাল নামে স্থানীয় খোজারখলা এলাকার একজন। আর বাকি সবগুলো পান রিমি ও তৌহিদ।

এই নিয়ে ক্ষুব্দ হয়ে উঠেন রিমি ও তৌহিদ। তারা তখন অধ্যক্ষকে বিভিন্ন ধরনের হুমকি প্রদান করেন। প্রতিষ্ঠান সূত্র জানায়, তাদের ভয়ে প্রতিষ্ঠান ছাড়া অধ্যক্ষ ড. মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ। তিনি সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজেরও অধ্যক্ষ্যের দায়িত্বে পালন করছেন। পলিটেকনিক্যালে না গিয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের বাস ভবনে বসবাস করে আসছেন। ওই প্রতিষ্ঠানের সুরমা হোস্টেল যেটিকে বিকল করে রেখেছে সিলেট পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। যেটি এখন মাদক আর অস্ত্রের আস্তানায় পরিণত হয়েছে। বার বার সেখানে অভিযান পরিচালনা করা হলেও কলেজ কর্তৃপক্ষ তাদেরকে আগে থেকে জানিয়ে দেয় অভিযানের কথা। সাবধানবশত তারা সবকিছু সরিয়ে নেয়। নেই কোন হোস্টেল সুপার। রিমি ও তৌহিদের নিজস্ব আইনে চলছে হোস্টেল। রিমি ও তৌহিদ বাহিনীর সুরমা হোস্টেলে যে সকল ছাত্ররা বসবাস করেন তাদেরকে প্রতিষ্ঠানে অধ্যক্ষ-শিক্ষক ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা বাঘের মতো ভয় পান। তারা দেখা করতে গেলে কলেজের অধ্যক্ষ ও শিক্ষকরা ভয়ে চেয়ার ছেড়েদেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এর আগে ইন্সটিটিউটে সুশান্ত কুমার বসু নামে একজন অধ্যক্ষ ছিলেন যিনি রিমি ও তৌহিদের বাহিনীর অপকর্মের প্রতিবাদ করতে গিয়ে বিভিন্নভাবে লাঞ্চিত হন। অবৈধভাবে পূজার নাম তার কাছ থেকে চাঁদা আদায় করতে গেলে তিনি দ্বিমত পোষণ করলে তার ব্যবহৃত গাড়ি এবং বাসা ভাঙচুর করা হয়। ঘটনাটি ঘটে ২০১৫ সালের ২৬ জানুয়ারি। রিমি ও তৌহিদের দখলে রয়েছে ইন্সটিটিউট’র ক্যাম্পাস এমনকি কর্তৃপক্ষও। তাদের অপকর্মের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেই সংশ্লিষ্টদের।

ছাত্রলীগের নেতাদের অধ্যক্ষ ও শিক্ষকরাও পর্যন্ত ভয় পান বলে জানান সাধারণ শিক্ষার্থীরা। জানা যায়, সিলেট পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটে রিমি ও তৌহিদের নির্দেশেই এসব অপকর্ম প্রতিষ্ঠানে প্রতিনিয়ত ঘটেই যাচ্ছে। তৌহিদের মূল বাড়ী বরিশাল আর রিমি’র ব্রাম্মনবাড়িয়ায়। তাদের পড়ালেখা শেষ হলেও জোর করে দখল করে আছে সুরমা হোস্টেল। তাদের নির্দেশেই এসব অপকর্ম প্রতিষ্ঠানে ঘটছে। প্রতিষ্ঠান কর্তপক্ষ জানান, রিমি ও তৌহিদ ইন্সটিটিউটের শিক্ষার্থী না হয়ে জোরপূর্বক ভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার কওে অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন।

সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও মহানগর আওয়ামী লীগের উপ-সম্পাদক বিধান কুমার সাহার নাম ভাঙ্গিয়ে ছাত্রলীগ নেতা সৈকত চন্দ্র রিমি ও তৌহিদ হাসান নেতৃত্বে চলছে প্রতিষ্ঠানে টেন্ডাবাজী-চাঁদাবাজি ও অধ্যক্ষ-শিক্ষকসহ সাধারণ শিক্ষার্থীদের উপর নিপীড়ন-নির্যাতন। সিলেট পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটে চলছে শিক্ষক-শিক্ষার্থী নির্যাতণের নির্মম চিত্র নিয়ে আমরা বেশ কয়েকটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছি। অসুন্ধানে জানা গেছে, সুরমা হোস্টেলে বসবাসকারী ছাত্রলীগ কর্মীদের তান্ডব লীলায় অতিষ্ঠ সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের রয়েছে ২টি টর্চার সেল একটি প্রকাশ্যে আরেকটি সুরমা হোস্টেলের ভিতরে রিমি ও তৌহিদের রুমে। সাধারণ ছাত্রদের কাছে চাঁদা চাইলে দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে তাদের বিভিন্ন কৌশলে হোস্টেলে নিয়ে কমর থেকে বেল্ট খুলে পাশবিক নির্যাতন চালানো হয়। আরেকটি টর্চার সেল রয়েছে ইন্সটিটিউটে প্রবেশ করলে দেখা যাবে গেইটের ডান পাশে ইন্সটিটিউটের মূল বিল্ডিংয়ের পেছনে চেয়ার নিয়ে বসে আছেন ক্যাম্পাস শিক্ষার্থীরা। সেখানে ডেকে নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের হয়রানী করে ছাত্রলীগ। তাদের বিরুদ্ধে কথা বলে স্থানীয় প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতাদের ব্যবহার করে আইশৃঙ্খলাবাহিনী দিয়ে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করে থাকেন। রিমি ও তৌহিদ বাহিনী ইন্সটিটিউিটের অধ্যক্ষ ড. আব্দুল্লাহ ভয়ভীতি দেখিয়ে বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে চাঁদা উত্তোলন করছেন। সুরমা হোস্টেলের উন্নতিকরণের কথা বলে বার বার টাকা আত্মসাৎ করছেন রিমি ও তৌহিদ।

শুধু কাগজপত্রে হোস্টেল সুপারের দায়িত্বে সরোজ কুমার হাওলাদার ও সহকারী সুপার এনামূল হকের নাম আছে কিন্তু কাজে নেই। তালিকভূক্তি ছাড়া প্রায় ২৫০ জন শিক্ষার্থী এখানে বসবাস করে আসছেন। হোস্টেলে বসবাসকারী শিক্ষার্থীদের নিয়মে জোরপূর্বকভাবে চলছে সুরমা ছাত্রবাস। এই বিষয় নিয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের ব্যবহারিত মুঠোফোনে কেন্দ্রীয় বার বার ফোন দেওয়া হলে রিসিভ করেন নি। তবে বিষয়টি নিয়ে আলাপ হয় কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগে সদস্য (সিলেট) রাহেল সিরাজের সাথে। তিনি প্রতিবেদককে জানান, ছাত্রলীগে কোন টেন্ডাবাজ-চাঁদাবাজদের স্থানে ছিল না। বিষয়টি কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সাথে আলাপ করে এসকল নামধারী টেন্ডারবাজ ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

অধ্যক্ষ স্যার ইন্সটিটিউটে না আসার বিষয়টি নিশ্চিত করে একাডেমীতে কর্মরত মালতি রানী জানান, কেন আসনে না জানিন না। আমি ছোট কর্মকর্তা সবকিছু খবর নেই না। তবে শুনেছি টেন্ডার নিয়ে কি সমস্যা হয়েছে। অধ্যক্ষ কলেজ না আসার বিষয়টি নিশ্চিত করে ইন্সটিটিউটের প্রশাসনিক শাখার সহকারী কর্মকর্তা বিপুলেশ চন্দ্র জানান, আমি নতুন আসছি সবকিছু জানিনা। স্যার ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে বসে কার্যক্রম পরিচালনা করেন। এই বিষয়ে ইন্সটিটিউটের অধ্যক্ষ ড. মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ মুঠোফোনে কি কারণে আমি অফিস করছি না সিলেটের সকল প্রশাসনিক শাখাসহ সবাইকে বলা আছে।

এই বিষয়ে তৌহিদ হাসান জানান, তিনি (অধ্যক্ষ) ক্যাম্পাসে কেন আসছেন না-কি কারণে আমার জানা নেই। টেন্ডারবাজি ও চাঁদাবাজির বিষয়টি সম্পন্ন মিথ্যা। বিষয়টি নিয়ে মুঠোফোনে আলাপ হয় সৈকত চন্দ রিমি’র সাথে। তিনি জানান, বহিরাগত ঠিকাদারের সাথে কাজের বিল নিয়ে কি সমস্যার কারণে আসছেন না শুনেছি। আমাদের সাথে কোন সমস্য নেই।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

ফেসবুকে সিলেটের দিনকাল