সীমান্ত গান্ধী খাঁন আব্দুল গফফার খাঁনের ৩৩ তম মৃত্যু দিবশে বিনম্র শ্রদ্ধা…

প্রকাশিত: ৮:৪১ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ২৫, ২০২২

সীমান্ত গান্ধী খাঁন আব্দুল গফফার খাঁনের ৩৩ তম মৃত্যু দিবশে বিনম্র শ্রদ্ধা…

🔴সীমান্ত গান্ধী খাঁন আব্দুল গফফার খাঁনের ৩৩ তম মৃত্যু দিবশে বিনম্র শ্রদ্ধা…
♦️”তোমরা আমাদেরকে নেকড়ের মুখে ছুড়ে দিচ্ছো” পাকিস্তান সৃষ্টির বিরুধীতা করে কংগ্রেসের উদ্দেশ্যে কথাগুলো বলেছিলেন।
◾তাঁর জন্ম ১৮৯০ সালে বর্তমান পাকিস্তানের পেশোয়ার উপত্যকায় তাঁর পিতার নাম বাহরাম খাঁন। তিনি ছিলেন পাকিস্তান এবং উপমহাদেশের অন্যতম আধুনিক,প্রগতিশীল রাজনৈতিক নেতা; ব্যক্তিগত জীবনে ধর্মপ্রান কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক চেতনার অধিকারী খাঁন আবুদুল গাফফার খাঁন সীমান্ত গান্ধী-বাদশা খাঁন-বাছা খাঁন (in English king khan) নামে পরিচিত ছিলেন।
পরিবারের উৎসাহে ততকালীন বৃটিশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিলেও উপমহাদেশীয় মানুষদের প্রতি বৃটিশদের আচার আচরনে বিক্ষুব্ধ হয়ে সেনাবাহিনী ত্যাগ করেন এবং পরবর্তি জীবনে রাজনীতি তথা অবহেলিত পশতুন্দের রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় সংগ্রাম করেন। প্রথমেই তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘খুদাই খেতমতগার’ নামে এক সংগঠন যার বাংলা করলে দাঁড়ায় ‘খোদার দাস’ কিংবা ‘আল্লাহ’র দাস’। যাদের অপর নাম ছিলো ‘লাল শার্ট’। পরিণতিতে তিনি তাঁর মাতৃভুমি থেকে বহিস্কৃত হন এবং তিনি ১৯২০ সালের দিকে মহাত্মা গান্ধি এবং ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সাথে রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তুলেন এবং যা ১৯৪৭ সালের ভারত বিভক্তি পর্যন্ত কার্যকর ছিলো। মহাত্মা গান্ধী প্রচারিত সত্যগ্রহে প্রভাবিত হয়ে গাফফার খান অহিংস আন্দোলন করেছিলেন। ‘খুদা-ই খেদমতগার’দের শপথ সম্পর্কে গাফফার খান বলেছিলেনঃ
“I am going to give you such a weapon that the police and the army will not be able to stand against it. It is the weapon of the Prophet, but you are not aware of it. That weapon is patience and righteousness. No power on earth can stand against it.”
প্রায় লক্ষাধিক সদস্য নিয়ে গঠিত ‘খুদাই খেতমতগার’ এর কর্মী এবং পাঠানরা রুখে দাঁড়ায় বৃটিশরাজের বিরুদ্ধে। এবং খুব কম সময়ের মাঝে তারা ‘খাইবার-পাখতুনওয়া’র একমাত্র রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। গাফফার খানের ভাই ডক্টর খান আব্দুল জাব্বার খান (ডঃ খান সাহেব নামে পরিচিত) রাজনৈতিক উইঙ্গএর নেতৃত্ব দেন এবং এবং ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এবং মুসলিম লীগ সরকার কর্তৃক অব্যাহতি দেওয়ার আগ পর্যন্ত ১৯২০ সাল থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত পশতুন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
গাফফার খান আর মহাত্মা গান্ধী দুজনের মাঝে আত্মিক, মানসিক এবং রাজনৈতিক সখ্য ছিলো অভাবনীয়; এবং লক্ষনীয় যে গাফফার খান ছিলেন মহাত্মা গান্ধীর তুলনায় অনেক বেশী বামপন্থী রাজনৈতিক ভাবনার অধিকারী। গাফফার খান ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের একজন সম্মানিত এবং জ্যাষ্ঠ্য সদস্য হওয়া সত্ত্বেও কংগ্রেসের কোনো নেতৃত্ব গ্রহন করেননি; এবং কংগ্রেস অনেক সময় মহাত্মা গান্ধীর নীতির সাথে দ্বিমত করলেও খান আব্দুল খান তাঁর রাজনৈতিক মিত্রের সাথেই ছিলেন আগা গোড়া।১৯৩৯ সালে কংগ্রেস গৃহীত যুদ্ধনীতির কারনে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি থেকে পদত্যাগ করলেও আবার যুদ্ধনীতি পরিবর্তন সাপেক্ষে তিনি কংগ্রেসে ফিরে আসেন। ১৯৩১ সালে কংগ্রেস তাঁকে নেতৃত্বে আনতে চাইলেও তিনি অস্বীকার করেন এই বলে-
“আমি সামান্য একজন যোদ্ধা এবং খোদার দাস আর আমি শুধু জনগনের সেবা করতে চাই”।
১৯৩০ সালের ২৩ শে এপ্রিল লবন সত্যাগ্রহের আন্দোলনে গাফফার খান গ্রেফতার বরন করেন এবং হাজার হাজার খুদাই খেদমতগার কর্মী পেশোয়ারের কিসসা-কাহানী বাজারে জমায়েত হন।সেখানে বৃটিশ সেনাদের মেশিনগানের গুলিতে ২০০-২৫০ খুদা-ই- খেদমতগার শহীদ হন। কিন্তু গাফফার খানের অহিংস নীতির শিক্ষায় অটল থেকে খুদা-ই-খেদমতগার কর্মীরা অহিংস প্রতিবাদ অব্যাহত রাখেন।
নারী মুক্তির প্রশ্নে অটল ধার্মিক ইসলামের সমতায় বিশ্বাসী খান আব্দুল গাফফার খান নারী মুক্তি এবং প্রগতিশীল ভাবনা থেকে বলেছিলেন-
“O Pathans! Your house has fallen into ruin. Arise and rebuild it, and remember to what race you belong.”
সীমান্ত গান্ধী মুসলীম লীগের দাবী এবং পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ঘোরবিরোধী ছিলেন এবং ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস যখন ভারত বিভক্তি মেনে নেয় তিনি তখন কংগ্রেসের উদ্দেশ্যে বলেছিলেনঃ
“তোমরা আমাদেরকে নেকড়ের মুখে ছুড়ে দিচ্ছো”।
ভারতবিভক্তির পর গাফফার খান ক্রমাগত পাকিস্তানী সরকার কর্তৃক জেল জুলুমের স্বীকার হন এবং ১৯৬০ এবং ১৯৭০ এর দশক তাঁর কেটেছে জেলে না হয় বিদেশে নির্বাসিত অবস্থায়।
গাফফার খান ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারী পাকিস্তান সংসদে সদস্য হিসেবে শপথ নেন এবং তাঁর রাজনৈতিক কার্যকলাপ অব্যাহত রাখেন।১৯৪৮ সালের ৮ মে গাফফার খান পাকিস্তানের প্রথম জাতীয় বিরোধী দল পাকিস্তান আজাদ পার্টির জন্ম দেন। উল্লেখ্য যে, পাকিস্তান আজাদ পার্টি প্রথম ধর্ম নিরপেক্ষ রাজনৈতিক দল।১৯৪৮ থেকে ১৯৫৪ সালে গৃহে অন্তরীন থাকেন এবং মুক্তি লাভের পর বাবরা’তে তাঁর সমর্থকদের উপর ততকালীন পাকিস্তানী সরকারের নির্যাতনের প্রতিবাদে পাকিস্তান এসেম্বলিতে জ্বালাময়ী ভাষায় প্রতিবাদ করেন।
১৯৫৮ সালে তাঁকে পাকিস্তান কেন্দ্রিয় সরকারে মন্ত্রী হিসেবে যোগদানের প্রস্তাব করা হলেও তিনি যথারীতি প্রত্যাখ্যান করেন এবং একই সময় আবার গ্রেফতার বরণ করেন এবং ১৯৬৪ সালে ভগ্নস্বাস্থ্যের কারনে মুক্তিলাভ করেন।১৯৬২ সালে এমোনেষ্টি ইন্টারন্যাশনাল তাঁকে ‘প্রিজনার অব দ্য ইয়ার’ ঘোষনা করে এবং এমোনেষ্টি’র ঘোষনায় বলা হয়-
“His example symbolizes the suffering of upward of a million people all over the world who are prisoners of conscience.”
সেপ্টেম্বর ১৯৬৪ সালে পাকিস্তানী কতৃপক্ষ চিকিতসার জন্য বৃটেন যাত্রার অনুমতি দেয় এবং সেখানে ডাক্তার তাঁকে আমেরিকায় সুচিকিৎসার জন্য উপদেশ দেন। ১৯৭২ সালে খাইবার-পাখতুনওয়া (নর্থ-ওয়েষ্ট ফ্রন্টিয়ার প্রভিন্স)এবং বেলুচিস্তানে তাঁর পুত্র খান আব্দুল ওয়ালী খানের নেতৃত্বে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)প্রাদেশিক পরিষদে জয় লাভ করে সরকার গঠন করলে জনগনের আহবানে তিনি আফগানিস্তান থেকে স্বেচ্ছা নির্বাসন থেকে ফেরত আসেন।
১৯৭৩ সালে কুটিল রাজনৈতিক নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টোকে মুলতানের জনসভায়-‘জঘন্যধরনের স্বৈরাচার’ বলায় আবারো গ্রেফতার বরন করেন। ১৯৮৪ সাল থেকে তিনি রাজনীতি থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন এবং ১৯৮৫ সালে তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনিত হন এবং ১৯৮৭ সালে প্রথম বিদেশী হিসেবে ‘ভারত রত্ন’ খেতাব লাভ করেন; যা ছিলো ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার।তাঁর শেষ রাজনৈতিক আন্দোলন ছিলো ‘কালাবাগ বাঁধ’ বিরোধী আন্দোলন। তাঁর কারাজীবন নিয়ে তাঁর নিজের বক্তব্য এমন-
“I had to go to prison many a time in the days of the Britishers. Although we were at loggerheads with them, yet their treatment was to some extent tolerant and polite. But the treatment which was meted out to me in this Islamic state of ours was such that I would not even like to mention it to you.
১৯৮৮ সালে গৃহে অন্তরিন থাকা অবস্থায় এ মহান জাতীয়তাবাদী-গনতান্ত্রিক-গনমুক্তি আন্দোলনের নেতা পরলোক গমন করেন এবং তাঁর অন্তিম ইচ্ছে অনুযায়ী আফগানিস্তানের জালালাবাদে হাজারো পাখতুন এবং শোষিত-নিপীড়িত মানুষের চোখের জলে তাঁকে সমাহিত করা হয়। তিনি ছিলেন পাখতুন এবং পৃথিবীর শোষিত-নিপীড়িত মানুষদের মুক্তির এক অদ্ভুত আলোকশিখা। তিনি আজীবন অসাম্প্রদায়িক-গনতান্ত্রিক-জাতীয়তাবাদী রাজনীতির মশাল হাতে আঁধারের যাত্রী হয়েছিলেন। আর তাঁর আজীবিনের স্বপ্ন ছিলো পাকিস্তান-আফগানিস্তানে বিভক্ত পাখতুনদের ঐক্য। উল্লেখ্য যে তাঁর মহাপ্রয়ানে ভারত সরকার পাঁচ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষনা করে। তাঁর মৃত্যু যাত্রায় যোগ দেন হাজার হাজার শোকার্ত মানুষ;তাঁরা পুর্বের পেশোয়ার থেকে খাইবার পাস অতিক্রম করে যান পশ্চিমের জালালাবাদে, অর্থাৎ পুর্বের পাঠানদের সাথে পশ্চিমের পাঠানদের এক আলোকিত ঐক্য গড়ে উঠেছে তাঁর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে।
সীমান্ত গান্ধী খাঁন আব্দুল গাফফার খাঁনের ৩৩তম প্রয়াণ দিনে আমার বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।
(সংগ্রহ- Khalid Iftekhar )
রুহুল কুদ্দুুুস বাবুল
২০.০১.২০২০

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

ফেসবুকে সিলেটের দিনকাল