সুনামগঞ্জের বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি, শহরে ঢুকছে পানি – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

সুনামগঞ্জের বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি, শহরে ঢুকছে পানি

প্রকাশিত: ১২:১৫ অপরাহ্ণ, জুলাই ২১, ২০১৬

sunamgong picসুনামগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। ভারত থেকে আসা পাহাড়ি ঢল ও অবিরত বৃষ্টির প্রভাবে ইতোমধ্যে জেলার ৭টি উপজেলা প্লাবিত হয়েছে, গৃহবন্দি হয়েছে অসংখ্য পরিবার, বেকার হয়েছেন লক্ষাধিক মানুষ।

গত এপ্রিলে আগাম বন্যায় ফসল হারিয়ে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার পর আবারো দীর্ঘস্থায়ী বন্যার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড ও আবহাওয়া বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার সুরমা নদীর ষোলঘর পয়েন্টে পানি গত চব্বিশ ঘন্টায় প্রায় ৪০ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপদসীমার ৯৩ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়াও বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত গড়ে ১১০ মিমি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

সুনামগঞ্জ জেলা শহরের ৪টি পয়েন্ট দিয়ে সুরমা নদী ও হাওরের পানি শহরে প্রবেশ করছে বলে জানান সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান বদরুল কাদির শিহাব। তিনি বলেন, “সুনামগঞ্জের কাজির পয়েন্ট, সাহেব বাড়ি ঘাট, নবীনগর ও লঞ্চঘাট দিয়ে শহরে পানি ঢুকছে”।

তিনি জানান, পাহাড়ি ঢল ও প্রবল বৃষ্টিতে সুনামগঞ্জ শহরের প্রায় শতাধিক বাড়িতে পানি উঠেছে। এছাড়াও বন্যার পানির কারণে বন্ধ রয়েছে বেশ কিছু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। শহরের নিচু এলাকার প্রায় সবকটি রাস্তার উপরে পানি থাকায় ব্যহত হচ্ছে যোগাযোগব্যবস্থা।

স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রে নিশ্চিতভাবে জানা যায়, জেলা সদর, দোয়ারাবাজার, বিশ্বম্ভরপুর, তাহিরপুর, জামালগঞ্জ, ধর্মপাশা ও শাল্লা উপজেলার বড় একটি অংশ প্লাবিত হয়েছে। এছাড়াও সুনামগঞ্জ সদরের সাথে তাহিরপুর উপজেলার সংযোগ সড়কের কয়েকটি অংশ বন্যার প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ায় জেলা সদরের সাথে বর্তমানে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে তাহিরপুর ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার।

এদিকে দোয়ারাবাজার উপজেলায়ও পাহাড়ি ঢলে রাস্তা ভেঙে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে উপজেলার বাংলাবাজার ও নরসিংপুর ইউনিয়নের। হুমকির মুখে রয়েছে ছাতক, ধর্মপাশা, জামালগঞ্জ ও বিশ্বম্ভবরপুর উপজেলার সাথে জেলা সদরের যোগাযোগ ব্যবস্থা। বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা সদরের বাজার প্লাবিত হওয়ায় বাজারের প্রায় সবকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। বৃহস্পতিবার বিশ্বম্ভরপুরে পার্শ্ববর্তী কয়েকটি উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে বড় চালের হাট বসার কথা থাকলেও বন্যার কারণে বসেনি এ হাট। এতে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন পার্শ্ববর্তী কয়েকটি গ্রামের ছোট ও বড় চাল ব্যবসায়ী এবং সাধারণ কৃষকরা।ন

নিচু অঞ্চল হিসেবে পরিচিত সুনামগঞ্জ মূলত হাওরাঞ্চল। এখানকার বেশিরভাগ মানুষের জীবিকার মূল উপজীব্য হচ্ছে কৃষিকাজ ও হাওরে মাছ ধরা। গত বোরো ধান তোলার সময়ে আকস্মিক আগাম বন্যায় প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে বোরো ধানের উৎপাদন। এখন আবারো বন্যা দেখা দেয়ায় বিকল্প কর্মসংস্থানের মাধ্যম মাছ ধরাও বন্ধ হয়ে গেছে।

এমন পরিস্থিতিতে জেলার কয়েকটি উপজেলাকে দুর্গত এলাকা হিসেবে ঘোষণা দেয়া হতে পারে বলে ভাবছেন স্থানীয়রা। তাহিরপুর ও ছাতকসহ কয়েকটি উপজেলার লক্ষাধিক মানুষের উপার্জনের একমাত্র মাধ্যম বালু ও পাথর মহালের কাজ বন্ধ হয়ে গেছে গত সপ্তাহেই। পাহাড়ি ঢলের কারণে বালু ও পাথর তোলা সম্ভব হচ্ছে না, ফলে বেকার হয়ে পড়েছেন এ অঞ্চলের বালু ও পাথর শ্রমিকরা।

এদিকে আকস্মিক পাহাড়ি ঢলে গত সোমবার ভেঙে যায় দোয়ারাবাজার উপজেলার খাসিয়ামারা রক্ষা বাঁধ। এতে পুরোপুরি প্লাবিত হয় উপজেলার ২০টি গ্রাম। এছাড়াও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আরো কয়েকটি বাঁধ ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন স্থানীয়রা।

সুনামগঞ্জের ধর্মপাশার ভাটাপাড়া গ্রামের আঙুর মিয়া বলেন, “গত সপ্তাহ থেকে বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের পানি উঠা শুরু হলেও মঙ্গলবার থেকে আক্রান্ত হয় উপজেলা। পরিস্থিতি দিনে দিনে আরো খারাপ হচ্ছে। এখন হাওরে মাছ ধরার সময়, কিন্তু বন্যার মধ্যে মাছ ধরবো কীভাবে? এর আগে আমরা ফসলও হারিয়েছি।”

সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ বিভাগীয় প্রকৌশলী দীপক কুমার দাস বলেন, “আকস্মিক পাহাড়ি ঢল ও টানা বৃষ্টিপাতে বন্যার পানি বাড়ছে, যা বিপদসীমা অতিক্রম করেছে অনেক আগেই। এ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে হয়তো সুনামগঞ্জে দীর্ঘমেয়াদী একটা মধ্যম মানের বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে”।

এ ব্যাপারে সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক শেখ রফিকুল ইসলাম জানান, প্লাবিত এলাকার সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করে ক্ষতিগ্রস্থদের সহায়তার ব্যবস্থা করার জন্য। তবে এখনই সুনামগঞ্জকে দুর্গত এলাকা ঘোষণা করা হচ্ছে না বলে জানিয়ে তিনি বলেন, পানি বাড়লে ও বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে পরবর্তীতে বিবেচনা করা হবে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

ফেসবুকে সিলেটের দিনকাল