স্বপ্নডুবির অভিযাত্রা যুবকদের পরিবার – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

স্বপ্নডুবির অভিযাত্রা যুবকদের পরিবার

প্রকাশিত: ৯:৩১ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০২০

স্বপ্নডুবির অভিযাত্রা যুবকদের পরিবার

পারভীন বেগম:
আমাদের যুবকরা অবৈধভাবে পাড়ি দিতে গিয়ে ভিনদেশের সাগরে ডুবে প্রাণ হারাচ্ছেন। সেকি কেবলই প্রলোভন? টাকা বানানোর নেশা? উন্নত জীবনের স্বপ্ন? নাকি দেশে কোনো কিছু করতে না পেরে ভিনদেশে কিছু একটা করার তাড়নায়? এ প্রশ্নগুলো আমাদের তাড়া করে বেড়ায়। দেশের শত শত নাগরিক টাকা উপার্জনের স্বপ্ন নিয়ে অবৈধভাবে ইউরোপ-আমেরিকা পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করছে। আর তাদের কাউকে কাউকে ভূমধ্যসাগরের জলে ডুবে যাচ্ছে!

ইউরোপ-আমেরিকা তো নয়, এ যেন এক ভয়ংকর মৃত্যুপথযাত্রা! গহিন অরণ্য, গভীর সমুদ্র, তপ্ত মরুভূমি পাড়ি দিয়ে ভয়ংকর স্বপ্নযাত্রায় পা রাখছে অনেক বেকার যুবক। ভয়ংকর এই স্বপ্নযাত্রায় সর্বস্ব বিক্রি করে দালালদের হাতে তুলে দিচ্ছে টাকা-পয়সাসহ পরিবারের শেষ সম্বল। কেউ কেউ অবৈধ পথে স্বপ্নের ঠিকানায় পৌঁছাতে পারলেও অধিকাংশই হয় ভাগ্যাহত। ভাগ্য সহায় হলে অনেকের জায়গা হয় কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে। বাকিদের কারও কারও সলিল সমাধি হয় নৌকাডুবিতে।

কেউ প্রাণ হারায় অনাহারে অর্ধাহারে, নানা রোগ-শোকে। তারপরও জীবনবাজি রেখে মৃত্যুকে হাতে নিয়ে এক মরীচিকার পেছনে ছুটছে হাজার হাজার তরুণ। তারা যেতে চায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন উন্নত দেশে। তবে যে উন্নত জীবনের টানে তারা ধাবিত হয় সেসব দেশ সম্পর্কে কোনো ধারণাই নেই নেশায় পাওয়া এই যুবকদের। তারা যা শোনে তা সবই লোকমুখে এবং দালালদের কাছ থেকে। প্রবাসী অধ্যুষিত অঞ্চল সিলেট।

ইউরোপ, আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কয়েক লাখ সিলেটি বসবাস করছেন। এদের সিংহভাগই বিদেশে গেছেন বৈধ পথে। কিন্তু অবৈধ পথে পা বাড়ানোর সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে। বিশেষ করে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাড়ি দেয়ার স্বপ্নে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ছেন সিলেটের অসংখ্য তরুণ-যুবক। তাদের অনেকেই দুর্গম যাত্রা পাড়ি দিয়ে স্বপ্নের দেশে পা রাখতে পারলেও বেশিরভাগের স্বপ্নই দুঃস্বপ্নে পরিণত হচ্ছে। প্রাপ্ত তথ্যানুসারে, গেল কয়েক মাসে ইউরোপের স্বপ্নে পা বাড়িয়ে মারা গেছেন সিলেটের অন্তত ২২ তরুণ-যুবক। এছাড়া নিখোঁজ রয়েছেন অন্তত ৮ তরুণ। গেল প্রায় ১০ মাস ধরে কোন খোঁজ মিলছে না তাদের। এসব তরুণের পরিবারে এখন ঘোর অন্ধকার।

জানা গেছে, ইউরোপে যেতে সিলেটের তরুণ-যুবকরা ঝুঁকি নিচ্ছে। তারা দালালদের মাধ্যমে অবৈধ পথে স্বপ্নের দেশে ঢুকতে টাকা খরচ করছে। কিন্তু অবৈধভাবে বিভিন্ন দেশে ঢুকতে গিয়ে প্রাণ যাচ্ছে তাদের। গত শুক্রবার ৭ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় সময় সাড়ে ১২টার দিকে গ্রিস সীমান্তের ভেতরে এক তুষার পাহাড়ে অতিরিক্ত ঠাণ্ডার কারণে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে অকালমৃত্যু হয় সিলেটের ফয়সলের। সিলেটের যুবক এনামুল এহসান জায়গিরদার ফয়সল (২৫)। নিহত ফয়সলের বাড়ি সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলার বোয়ালজুড় ইউনিয়নের রাজাপুর গ্রামে। তার বাবা মুশহুদ আহমদ জায়গীদার। তিন ভাই, এক বোনের মধ্যে ফয়সল ছিলেন দ্বিতীয়। গত বছরের ৯মে লিবিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় উপকুলের জুয়ারা শহর থেকে অন্তত ৭৫ জন অভিবাসী নিয়ে ইউরোপের দেশ ইতালির উদ্দেশ্যে সাগর পথে রওয়ানা দেয় একটি বড় নৌকা।

অভিবাসীদের মধ্যে প্রায় ৬০ জন ছিলেন বাংলাদেশি। তিউনিসিয়ার উপকুলে ওই নৌকা থেকে অভিবাসীদের ছোট একটি নৌকায় তোলার সময় সেটি ডুবে যায়। এতে নিহত হন অর্ধশতাধিক অভিবাসী। নিহতদের মধ্যে বাংলাদেশি ছিলেন ৩৭ জন, যেখানে অন্তত ২০ জন ছিলেন সিলেট অঞ্চলের। এদিকে, সিলেট সদর উপজেলার হাটখোলা ইউনিয়নের পাগইল গ্রামের মখলিছুর রহমানের ছেলে শাহীন আহমদ বছর দুয়েক আগে ইরাকে গিয়েছিলেন। তার লক্ষ্য ছিল ইতালি যাওয়া। ইরাক থেকে দালালের মাধ্যমে তুরস্ক হয়ে গ্রিসে যান শাহীন। গেল ২৩ আগস্ট ইতালির উদ্দেশ্যে একটি ভ্যানে চড়ে আরো কয়েকজনের সঙ্গে রওয়ানা দেন তিনি।

কিন্তু পথিমধ্যে মেসিডোনিয়ার দেবার নামক স্থানে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন শাহীন। ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপ চলাকালে সে দেশে যান সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার কারিকোনা গ্রামের ফরিদ উদ্দিন। পরে দালালের মাধ্যমে ইউক্রেনে ঢুকেন তিনি। এরপর স্লোভাকিয়া হয়ে ইতালি যাওয়ার পথে জঙ্গলে মারা যান ফরিদ। গত ২৮ আগস্ট ইতালির পথে দালালসহ আরো কয়েকজনের সঙ্গে রওয়ানা দিয়েছিলেন তিনি। এরপর থেকে তার কোনো খোঁজ পাচ্ছিল না দেশে থাকা পরিবার। পরে ৯ সেপ্টেম্বর স্লোভাকিয়ার জঙ্গল থেকে ফরিদের মরদেহ উদ্ধার করে দেশটির পুলিশ। গত ৩ অক্টোবর তার মরদেহ দেশে আনা হয়। জানা গেছে, ইউরোপের দেশে যাওয়ার পথে নিখোঁজ রয়েছেন সিলেটের অন্তত ৮ তরুণ।

নিখোঁজ এই তরুণরা হলেন- কানাইঘাট উপজেলার দাওয়াদিরি গ্রামের ইমদাদ আহমদের ছেলে জাকারিয়া আহমদ, জকিগঞ্জ উপজেলার গড়রগ্রামের এমাদ উদ্দিনের ছেলে তোফায়েল আহমদ, বিয়ানীবাজার উপজেলার লাউতা ইউনিয়নের উত্তর গাংপার গ্রামের আব্দুল লতিফের ছেলে আলতাফ হোসেন, কুড়ারবাজার ইউনিয়নের খশির চাতল গ্রামের মিছবাউল হকের ছেলে সুলতান মাহমুদ পলাশ, একই ইউনিয়নের আব্দুল্লাপুর গ্রামের আছার উদ্দিনের ছেলে জুবেল আহমদ, খশির গ্রামের ছয়দুর রহমানের ছেলে আবু তাহের, খশির নয়াবাড়ী গ্রামের সাইদুল হকের ছেলে ওবায়দুল হক এবং মুড়িয়া ইউনিয়নের পশ্চিম ঘুঙ্গাদিয়া গ্রামের মিনহাজ উদ্দিনের ছেলে আবু সুফিয়ান। ভূমধ্যসাগরে যে যুবাদের স্বপ্ন ডুবে গেল, তাদের, তাদের পরিবারের সদস্যদের অভিশাপ কি সংশ্লিষ্টদের তাড়া করবেন না।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •