স্বাধীনতার ৪৯ বছরেও নির্মিত হয়নি দক্ষিণ কামলাবাজ গণহত্যার স্মৃতিস্তম্ভ – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

স্বাধীনতার ৪৯ বছরেও নির্মিত হয়নি দক্ষিণ কামলাবাজ গণহত্যার স্মৃতিস্তম্ভ

প্রকাশিত: ১০:৫৩ অপরাহ্ণ, মার্চ ২৫, ২০২০

স্বাধীনতার ৪৯ বছরেও নির্মিত হয়নি দক্ষিণ কামলাবাজ গণহত্যার স্মৃতিস্তম্ভ

মো. ওয়ালী উল্লাহ সরকার, জামালগঞ্জ:
১৯৭১ সালের ১০ আগস্ট (আনুমানিক) সোমবার ভোরে দক্ষিণ কামলাবাজ গ্রামে ১২ জন মুক্তিকামী মানুষকে টেনেহেছড়ে নিয়ে গ্রামের জব্বার কমাণ্ডারের বাড়ির উঠানে লাইন ধরে গুলি করে হত্যা করে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ও তার দোসররা। সরকারিভাবে বিভিন্ন জায়গায় কিছু স্থান সংরক্ষণ করা হলেও দক্ষিণ কামলাবাজ গ্রামের এখনও বধ্যভূমি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। দ্রুত স্থান চিহ্নিত করে বধ্যভূমি হিসেবে ঘোষণাসহ স্মৃতিস্তম্ভ তৈরির দাবি উপজেলার মুক্তিযোদ্ধাসহ স্থানীয়দের।

এলাকার প্রবীণ ১৩ জনের মধ্যে বেঁচে যাওয়া একজন দক্ষিণ কামলাবাজ গ্রামের আব্দুল কুদ্দুস (৮২)। তিনি জানান, দক্ষিণ কামলাবাজ গ্রামের আব্দুল জব্বার কমাণ্ডার ছিলেন ট্রেনিপ্রাপ্ত আনসার কমাণ্ডার। তাই তিনি অস্ত্র চালনায় পারদর্শী ছিলেন। গ্রামের কিছু যুবক ছেলেদের যুদ্ধে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে গোপনে তাদেরকে সংঘটিত করে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছিলেন। কিন্তু বিধিবাম হওয়ায় রাজাকাররা সংবাদ পেয়ে গেল তাদের প্রশিক্ষণসহ যুদ্ধে যাওয়ার প্রস্তুতির কথা।

তিনি আরও জানান, ওইদিন ভোরে হঠাৎ গুলির শব্দ শোনা যায়। পরে আমার বোনজামাই শামসু মিয়াকে বলি, গুলির শব্দ শোনা যাচ্ছে। তিনি জানান বোধ হয় মুক্তিযোদ্ধারা গুলি করছে। এর কিছুক্ষণ পরেই দেখা যায় মুক্তিরা আমার ঘরের পেছন দিয়া দৌড়াইয়া চলে যায়। তারা যার যার জান বাঁচান বলে চিৎকার দিতে দিতে চলে যায়। আমার বোনজামাই আমাকে বলে মাটিতে শুয়ে পড়। দুই বাচ্চা নিয়া ঘরের দরজা লাগাইয়া শুয়ে পড়লাম। মুক্তিরা চলে যাওয়ার পর পাকিস্তানীরা আইসা আমার বরই গাছের সামনে একটা ফাঁকা গুলি করে। তখন আমার মেয়ে আমার কোলে থেকে চিৎকার করে। সাথে সাথে পাঞ্জাবীরা এসে আমার দরজা ভেঙ্গে আমাকে ও আমার বোনজামাই শামসু মিয়াকে ধরে ফেলে। আমার মেয়েকে কোল থেকে টান মেরে ফেলে আমাকে এবং শামসু মিয়াকে ধরে গিয়াস উদ্দিনের বাড়িতে নিয়ে আয়াত আলী ও তার কামলাকে ধরে ফেলে। ৪ জনকে নিয়ে আব্দুল মিয়ার বাড়িতে যায়। আমাদের ঘরে ঢুকাইয়া বলে মুক্তি আছে কি না দেখ। আমরা ঘরে ঢুকলে আব্দুলের মা বলে, বাবারে আমাদের বাড়িতে কোন মুক্তি নাই। ঘর থেকে বের হয়ে আমরা বলি, স্যার কেউ ঘরে নাই। তখন পাঞ্জাবীরা আবার ঘরে ঢুকে বড় মটকার ভেতর থেকে আব্দুল মিয়াকে বের কইরা আনে। আমাদের সামনে আব্দুল মিয়াকে খুবই মারধর করে। তারপর প্রতিটি ঘর দেখে যেতে থাকে। আমাদের একেকজনকে একেক ঘর দেখতে বলে মুক্তি আছে কি না।

আমি জব্বর কমাণ্ডারের ঘর দেখে কাউকে না পেয়ে সিদ্দিক মিয়ার ঘরে ঢুকি। জব্বার মিয়ার বাড়ির উঠানে গিয়ে আয়াত আলী, আব্দুল মিয়া, শামছু মিয়া, কালু মুন্সি, আয়াত আলীর কামলা ও কমলার মাসহ সকলকে লাইন ধরিয়েছে। তাদেরকে লাইন ধরানো দেখে আমি ঘরের পেছনের দরজা দিয়ে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে একটি ঝোঁপের ভিতরে নাক ভাসিয়ে পানিতে পড়ে থাকি। সেখানে থেকে একটি গুলির শব্দ শুনতে পাই। তখন সবার চিৎকার শুনতে পেয়ে আমি ডুব দিয়ে দিয়ে নদীর পার দিয়ে নয়াহালট গ্রামের মৌলভী স্যারের বাড়ির সামনে গেলে মৌলভী স্যার নদীর পার থেকে আমাকে দেখে বলে কুদ্দুছ মিয়া, তুমি পানিতে ভাইসা আইছ কেন? আমি বলি, স্যার, আমার সাথের সবাইকে গুলি করে মাইরা ফেলাইছে। আমি নদীতে পড়ে ডুব দিতে দিতে এখানে এসেছি। আমার পড়নে কোন কাপড় নেই। একটা কাপড় দেন। তিনি তার গামছাটি গলা থেকে দিয়ে বলে এই গামছাটি পড়ে উঠ। গামছা পড়ে উঠার পর আগুনের ছেক দিয়ে আমাকে সুস্থ করে তুলেন। নয়াহালট থেকে দেখতে পাই দক্ষিণ কামলাবাজ গ্রামে আগুনের ধোয়া উঠছে এবং গ্রামের লোকজন দৌড়াইয়া নয়াহালটের দিকে যাচ্ছে। আমিও গামছা পড়ে চাঁনপুর আমার শ্বশুর বাড়িতে চলে যাই। রাত বেলা আমার স্ত্রী ও ছেলেমেয়েসহ চাঁনপুর চলে যাই। ওই রাতেই পরিবার নিয়ে তাহিরপুরের কলাগাঁও গ্রামে চলে যাই।

ওইদিন পাঞ্জাবীদের গুলিতে নিহত আয়াত আলীর ছেলে গিয়াস উদ্দিন জানান, আমাদের বাড়ির পাশে (বর্তমান ইউনিয়ন অফিস) মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প ছিল। হঠাৎ করে পাঞ্জাবীরা অতর্কিত আক্রমণ করলে মুক্তিযোদ্ধারা নদীর পার দিয়ে যার যার জান বাঁচাও বলে চিৎকার করতে করতে চলে যায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই পাঞ্জাবীরা এসে আমার বাবা এবং ভাই আব্দুর রহমান, কালু মিয়া, জজ মিয়া, কালা মিয়া, মহরম আলী, হারুন মিয়াকে ধরে নিয়ে গিয়ে জব্বার কমাণ্ডারের বাড়ির উঠানে গুলি করে মেরে ফেলে। পরে কয়েকটি বাড়িতে আগুন জ্বালিয়ে সব পুড়িয়ে দেয়। এর আগেও আমাদের গ্রামের জব্বার কমাণ্ডার ও জামালগঞ্জের কাজী ছাদ উল্লাহকে পাঞ্জাবিরা ধরে নিয়ে যায়। তারা আর ফিরে আসেননি।

মুক্তিযোদ্ধা সাবেক কমাণ্ডার অ্যাডভোকেট আসাদ উল্লাহ সরকার জানান, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে যারা শহীদ হয়েছেন তাদের শহীদ স্থান নির্ধারণ করে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের নির্দেশ দেওয়া সত্বেও অদ্যাবধি পর্যন্ত দক্ষিণ কামলাবাজ গ্রামের শহীদ স্মৃতি বিজড়িত স্থানে স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি হয়নি। আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীসহ সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক ও উপজেলা প্রশাসন কর্তৃপক্ষের প্রতি জোর দাবি জানাচ্ছি, দ্রুত দক্ষিণ কামলাবাজ গ্রামে ১২ জন শহীদের স্মৃতি রক্ষায় স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হোক।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

ফেসবুকে সিলেটের দিনকাল