হবিগঞ্জে ৫০০ বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী গায়েবি ‘মাছের ঘাট’! – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

হবিগঞ্জে ৫০০ বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী গায়েবি ‘মাছের ঘাট’!

প্রকাশিত: ৪:৪৪ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১১, ২০২০

হবিগঞ্জে ৫০০ বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী গায়েবি ‘মাছের ঘাট’!

নিউজ ডেস্ক:
হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ পৌর শহরের কেন্দ্রস্থলেই দাউদনগর গ্রাম। এ গ্রামের দক্ষিণ অংশে রয়েছে ছাওয়াল পীরের মাজার এবং ঐতিহ্যবাহী গায়েবী গজার মাছের পুকুর। এলাকার মানুষের কাছে ‘মাছের ঘাট’ নামেই বেশ পরিচিত। গায়েবী গজার মাছ দেখতে সরজমিনে গিয়ে শুনা যায় নানা কাহিনী। তবে কেউই সঠিক করে ‘মাছের ঘাট’ সম্পর্কে কিছু বলতে পারেননি।

এলাকাবাসী জানান, প্রায় ৫০০ বছর আগে ৩৬০ আউলিয়ার সফর সঙ্গী ছিলেন বন্দেগী শাহ সৈয়দ মহিবুল্লা (রঃ)। তিনি সৈয়দ নাছির উদ্দিন (রঃ) বংশধর। বন্দেগী শাহ সৈয়দ মহিবুল্লা (রঃ) তৎকালীন সময়ে দাউদনগর গ্রামের বড় হাবেলীর বড়বাড়িতে বসবাস করতেন। তিনি ইবাদত বন্দিগী করতেন পুকুরপাড়ের ছোট ঘরে। সে সময় ইবাদতখানার পাশে ছোট একটি ডোবা ছিল। বন্দেগী শাহ সৈয়দ মহিবুল্লা (রঃ) যখন ইবাদতে মশগুল থাকতেন তখন তার মাথার উপর দিয়ে জ্বীন, পরী যাতায়াত করতো এবং তার কাছে মুরীদ হওয়ার জন্য আবদার রাখতো। তিনি বলতেন মুরীদ হতে পারো, তবে শর্ত হল তোমরা ‘মাছের’ রূপ ধারণ করতে হবে। তখন তারা বলে মাছ হলে খাওয়াবে কে? তিনি (সৈয়দ মহিবুল্লা) বলেন, মানুষ তোমাদের খাওয়াবে। সেই সময় থেকে বন্দেগী শাহ সৈয়দ মহিবুল্লা (রঃ) দেওদানবদের ‘বন্দি’ করে ছোট ডোবায় ‘গজার মাছ’ রূপ ধারণ করান।

কথিত আছে গজার মাছের ছোট ডোবাকে বড় করে দেওয়ার জন্য স্বপ্নে দেখে পাশ্ববর্তী বিরামচর গ্রামের হিন্দু জমিদার কাশীচন্দ্র বিশ্বাস। এসময় তার ছেলে ও পৌত্ররা নিজ খরচে খনন করেন ‘গায়েবী গজার মাছের পুকুর’। এখনো প্রতিদিন শত শত নারী পুরুষ ও ভক্তরা গজার মাছ দেখতে ভিড় করে ‘মাছের ঘাটে’।

সরজমিনে ঘুরে দেখা যায়- দর্শনার্থীরা গজার মাছের খাবার হিসেবে ছোট মাছ কিংবা মাংস নিয়ে আসছে। গজার মাছগুলো ছোট মাছ ও মাংস ছাড়া আর কিছু দিলে খায় না। গ্রামের লোকজন বলেন, অসুখ ও বিপদে এ পুকুরের পানি নিয়ত করে পান করলে উপকার পাওয়া যায়।

মাছের ঘাট পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত সৈয়দ ফয়সল আহমেদ জানান, বন্দেগী শাহ সৈয়দ মহিবুল্লা (রঃ) এর পায়ের ‘করম’ ও হীরার তৈরি হাতের ‘বাজু’ তাদের সংগ্রহে আছে। অনেকেই করমের সামান্য অংশ কেটে নিয়ে নিয়ত করে তাবিজ বানিয়ে ব্যবহার করছেন।

স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর জালাল উদ্দিন মোহন বলেন, ১৯৮৮ সালে বন্যায় গজার মাছের পুকুর তলিয়ে গেলে দু’একটি গজার মাছ ভেসে যায়। আর ওই মাছ জেলেদের জালে ধরা পড়লে জেলেরা মাছগুলো আবার পুকুরের খাদেমের কাছে জীবন্ত অবস্থায় হস্তান্তর করে। আরো জানা যায় গায়েবী গজার মাছ কোনো কারণে মারা গেলে মাছগুলোকে পুকুরপাড়ে কবর দেওয়া হয়।

সৈয়দ ফয়সল আহমেদ জানান, ১৯৮৮ সালের বন্যার পর দুষ্কৃতিকারীরা পুকুরে বিষ ফেলে গজার মাছ মারার ফন্দি করেও ব্যর্থ হয়। ওই সময় দু’চারদিন গজার মাছ দেখা না গেলেও পুনরায় গজার মাছ ভেসে উঠে। ২০০৭ সালে পুকুরটি পুনরায় খনন করা হয় এবং ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে শায়েস্তাগঞ্জ পৌর পরিষদ প্রায় ৪ লাখ টাকা খরচ করে পুকুরের চারদিকের রিটেইনিং ওয়াল ও ঘটলা নির্মাণ করে দেয়।

২০১৮ সালের জুলাই মাসে আবারো দুষ্কৃতিকারীদের চোখ পড়ে মাছের ঘাটে। রাতে আঁধারে কে বা কারা বিষ প্রয়োগ করে পুকুরে। সকাল থেকে গজার মাছ মরতে শুরু করে। এক সপ্তাহ ধরে মাছ মরতে থাকে। কর্তৃপক্ষ দমকল লাগিয়ে পুকুরের বিষাক্ত পানি সেচ করে বাইর থেকে নতুন পানি দিয়ে পুকুরে দেওয়া হয়। সপ্তাহখানেক পরই পুকুরে মজার মাছ দেখা দেয়। এখনো সপ্তাহের প্রতিদিনই লোকজন আসছেন গজার মাছ দেখতে। তবে শুক্র ও শনিবার দর্শনার্থীর সংখ্যা বেশি হয় বলে জানান দায়িত্বে থাকা সৈয়দ ফয়সল আহমেদ।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •