হবিগঞ্জ পৌরসভায় বিএনপির ভরাডুবির নেপথ্যে – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

হবিগঞ্জ পৌরসভায় বিএনপির ভরাডুবির নেপথ্যে

প্রকাশিত: ৩:১৪ অপরাহ্ণ, মার্চ ২, ২০২১

হবিগঞ্জ পৌরসভায় বিএনপির ভরাডুবির নেপথ্যে

অনলাইন ডেস্ক : হবিগঞ্জে পৌরসভাকে বিএনপির ঘাঁটি হিসেবেই ধরা হয়। ২০০৪ সাল থেকে পৌরসভাটি বিএনপির দখলে চলে যায়। এখানে তাদের শক্তি কতটা সেটি বুঝা গেছে ২০১৫ সালের নির্বাচনে। ওই নির্বাচনে কারাগারে থেকেও আওয়ামী লীগ প্রার্থীকে পরাজিত করে মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন বিএনপি প্রার্থী জিকে গউছ।

কিন্তু এই পৌরসভাতেই এবার জামানত হারানোর লজ্জায় পড়েছে বিএনপি। এর আগে হবিগঞ্জ পৌরসভায় এমন ভরাডুবি দেখেনি দেশের অন্যতম শক্তিশালি এই দলটি। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদি দল (বিএনপি) মনোনীত জেলা বিএনপি’র যুগ্ম-আহবায়ক এডভোকেট এনামুল হক সেলিম ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ৩ হাজার ২৪২ ভোট।

অবশ্য এই ভরাডুবির জন্য দলের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দকেই দায়ি করছেন দলটি একাংশেন নেতাকর্মীরা। তারা বলছেন- দলিয় মনোনয়ন না পাওয়ার ক্ষোভ আর কোন্দলের কারণে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

নেতাকর্মীদের ভোট গেল কই?

জেলা বিএনপি সূত্রে জানা যায়- জেলা, পৌর, হবিগঞ্জ পৌরসভার মাতৃসংগঠন বিএনপির ৯টি ওয়ার্ড কমিটি রয়েছে। প্রতি কমিটি ৭১ সদস্য বিশিষ্ট। সেই হিসেবে ওয়ার্ড বিএনপির মোট সদস্য সংখ্যা ৬৩৯ জন। পরিবারের অন্যদের বাদ দিয়ে শুধুমাত্র এসব কমিটির সদস্য ও তাদের স্ত্রীদের ভোট বিএনপির বাক্সে পড়লে ওয়ার্ড কমিটি থেকে তাদের ভোট আসত ১ হাজার ২৭৮ টি। সেই সাথে জেলা, উপজেলা ও পৌর কমিটিতো আছেই।

অন্যদিকে, ছাত্রদলের ৫১ সদস্য বিশিষ্ট ওয়ার্ড কমিটি অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। অর্থাৎ ৯টি ওয়ার্ড কমিটির সদস্য সংখ্যা হবে ৪৩৯ জন। একই অবস্থা যুবদল, সেচ্ছাসেবক দলসহ বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনেরও। প্রতিটিতে রয়েছে ৫ শতাধিকের। সেই সাথে কর্মী-সর্মথকতো আছেই।

হিসেব অনুযায়ি জেলা, পৌর, ওয়ার্ড বিএনপি ও অঙ্গ সহযোগী সংগঠন মিলিয়ে অন্তত ৫ হাজার সদস্য রয়েছে দলটিতে। এছাড়া দলকে শক্তিশালী করতে প্রতিটি পাড়ায়ও আলাদা কমিটি রয়েছে তাদের। অথচ এখানে বিএনপি ভোট পেয়েছে মাত্র ৩ হাজার ২৪২টি।

শীর্ষ নেতাদের হোম সেন্টারেও লজ্জার হার

হবিগঞ্জ জেলা বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের হোম সেন্টারেও হেরেছেন বিএনপি প্রার্থী। এখানে শুধু হারেইনি, পেয়েছেন চরম লজ্জাও। ২০১৫ সালের নির্বাচনে যেখানে বিএনপির বাক্সে ভোট পড়ত হাজারের উপর সেখানে এবার ভোট পড়েছে ২০০/২৫০টি। কোনটিতে আরও কম।

নাতিরাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রটি জেলা ছাত্রদল সাধারণ সম্পাদক রুবেল আহমদের হোম সেন্টার। ২০১৫ সালে বিএনপি প্রার্থী কারাগারে থেকে নির্বাচন করলেও এই কেন্দ্রে পেয়েছিল ১ হাজার ২১২ ভোট। অথচ এবার এই কেন্দ্রে বিএনপি প্রার্থী সেলিম পেয়েছেন মাত্র ১৯৬ ভোট।
হবিগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রটি যুবদল সভাপতি মিয়া মোহাম্মদ ইলিয়াছের হোম সেন্টার। ২০১৫ সালের নির্বাচনে এই কেন্দ্রে বিএনপি ভোট পেয়েছিল ৫০৮টি। এবার এই কেন্দ্রে বিএনপির বাক্সে ভোট পড়েছে মাত্র ১৫৭টি।

২০১৫ সালের নির্বাচনে কারাগারে থেকেও মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন জেলা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক ও কেন্দ্রীয় বিএনপির সমবায় বিষয়ক সম্পাদক জিকে গউছ। তার হোম সেন্টার গাউছিয়া প্রি ক্যাডেট একাডেমি কেন্দ্রটি। ২০১৫ সালের নির্বাচনে এই কেন্দ্রে তিনি ভোট পেয়েছিলেন ১ হাজার ১৮৭টি। কিন্তু এবার শীর্ষ এই নেতার হোম সেন্টারে বিএনপির বাক্সে ভোট পড়েছে মাত্র ৪৫০টি। অথচ এই ওয়ার্ডে জিকে গউছের সবচেয়ে আস্তাভাজন (ডানহাত খ্যাত) হিসেবে পরিচিত শফিকুর রহমান সিতু কাউন্সিলর হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন।

১নং ওয়ার্ডটি জেলা বিএনপির আহবায়ক আবুল হাসিমের হোম সেন্টার। তিনি ওই ওয়ার্ডের টানা তিনবারের কাউন্সিলরও। এবারও তিনি ১ হাজার ৪৭৯ ভোট পেয়ে কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন। অথচ জেলা বিএনপির অভিভাবকের এই ওয়ার্ডে দলের প্রার্থী ভোট পেয়েছেন মাত্র ১৭৬টি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির একাধিক নেতা অভিযোগ করেন, দলিয় কোন্দন থাকার কারণে অনেকেই বিএনপি প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেননি। আবার যারা দলীয় মনোনয়ন চেয়েছিল কিন্তু পাননি তারাও বিএনপি প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেননি। যে কারণে তাদের হোম সেন্টারগুলোতেও বিএনপি প্রার্থী চরম অপমানীতভাবে পরাজিত হয়েছেন।

মনোনয়ন চেয়েও না পাওয়া জেলা যুবদল সভাপতি মিয়া মোহাম্মদ ইলিয়াছের হোম সেন্টারে নিজের দলিয় প্রার্থীর ভরাডুবির কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অন্য সময় জনগণ বিএনপিকে চেয়েছিল, এবার হয়তো চায়নি। যে কারণে বিএনপির ভোট কমেছে। এছাড়া নির্বাচনে ডিজিটাল কারচুপি হয়েছে। অনেকে অভিযোগ করেছেন ভোট দিতে গিয়ে একটি মাত্র মার্কা পেয়েছেন। সব মিলিয়েই বিএনপি প্রার্থীর ভোট কম হয়েছে।’

জেলা বিএনপির আহবায়ক আবুল হাসিম বলেন, ‘এর আগে হবিগঞ্জ পৌরসভা নির্বাচনে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করেছেন জিকে গউছ। তিনি একজন জনপ্রিয় নেতা এবং জনগণের কাছে ঠিকভাবে পৌঁছাতে পেরেছেন। যে কারণে জনগণও তাকে ভোট দিয়েছে। এভাবেব প্রার্থী হয়তো জনগণের কাছে খুব একটা পৌঁছাতে পারেননি। যে কারণে ভরাডুবি হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘এবার বিএনপি প্রার্থী ছিলেন এনামুল হক সেলিম। তিনি একটি গ্রæপের রাজনীতি করতেন। যে কারণে বিএনপির অনেক নেতাকর্মী তার সাথে ছিল না।’

তবে দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ নেই প্রার্থী এনামূল হক সেলিমের। তিনি দাবি করেন, সরকার, প্রশাসন এবং ইভিএম মেশিন তার বিপক্ষে ছিল। যে কারণে তার ভরাডুবি হয়েছে।

২৮ ফেব্ররুয়ারি হবিগঞ্জ পৌরসভা নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী হবিগঞ্জ জেলা যুবলীগ সভাপতি আতাউর রহমান সেলিম নৌকা প্রতীক নিয়ে ১৩ হাজার ৩২২ ভোট পেয়ে মেয়র নির্বাচিত হয়েছে। তার নিকটতম প্রতিদ্ব›দ্বী বর্তমান মেয়র (আ’লীগ বিদ্রোহী) মিজানুর রহমান মিজান নারিকেল গাছ প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ১০ হাজার ৯৯০ ভোট।

নির্বাচনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন ৬ জন। তারা হলেন, আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী হবিগঞ্জ জেলা যুবলীগ সভাপতি আতাউর রহমান সেলিম, আওয়ামী লীগ বিদ্রোহী বর্তমান মেয়র মিজানুর রহমান মিজান, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদি দল (বিএনপি) মনোনীত প্রার্থী জেলা বিএনপি’র যুগ্ম-আহবায়ক এডভোকেট এনামুল হক সেলিম, হাতপাখা মার্কা নিয়ে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী আলহাজ্ব সামছুল হুদা, স্বতন্ত্র প্রার্থী বশিরুল আলম কাওছার ও গাজী পারভেজ হাসান।

হবিগঞ্জ পৌরসভায় ৫০ হাজার ৯০৩ জন ভোটার থাকলেও মোট ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন ২৯ হাজার ৬ জন। এর মধ্যে বৈধ ভোটের সংখ্যা ২৮ হাজার ৯১৬টি এবং বাতিল ভোটের সংখ্যা ৯০টি। হবিগঞ্জ পৌরসভা নির্বাচনে ভোট পড়েছে ৫৬.৯৮ শতাংশ।

১৮৮১ সালে প্রতিষ্ঠিত ৯ দশমিক ৫ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের প্রথম শ্রেণির এ পৌরসভায় বসবাস করেন প্রায় লক্ষাধিক মানুষ।