২৩ দম্পতির জীবনে ‘না’ জয়ের হাসি – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

২৩ দম্পতির জীবনে ‘না’ জয়ের হাসি

প্রকাশিত: ৯:০৭ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ৯, ২০১৬

২৩ দম্পতির জীবনে ‘না’ জয়ের হাসি

0f570e3c32d4e40e44c2a1fdbd05b0b5উজ্জ্বল মেহেদী,৮ অক্টোবর ২০১৬, শনিবারপ্রবাসী দম্পতির চার বছর বয়সী ছেলে। জন্মের পর থেকে নানা অসুস্থতা তার কাটছিল না। শেষমেশ চলছিল জন্ডিসের চিকিৎসা। তাতেও যখন রোগটি সারছিল না, তখন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন ওই দম্পতি। ধরা পড়ে এইচআইভি সংক্রমণ। মা-বাবার শরীর থেকে সন্তানের শরীরে ছড়ায় এ ব্যাধি। ছয় মাসের মাথায় ছেলেটি মারা যায়। এইচআইভি পজিটিভ বহনকারী ওই দম্পতি নিঃসন্তান হয়ে পড়েন। নিঃসঙ্গ জীবনে নিদারুণ হতাশার মধ্যে একদিন খবর পেলেন এইচআইভি পজিটিভ শরীরে বহন করলেও চিকিৎসায় এইচআইভি সংক্রমণমুক্ত সন্তান জন্ম দেওয়া সম্ভব।
সে অনুযায়ী চিকিৎসা নেন ওই দম্পতি। গত ২ মে সন্তানহারা ওই দম্পতির কোলজুড়ে আসে এইচআইভিমুক্ত যমজ দুই ছেলে। এ যেন তাঁদের জীবনে ‘না’ জয়ের হাসি। যমজ দুই শিশুকে কোলে তুলে স্বামী-স্ত্রী দুজনের কথায় এক সুর, ‘আমরার পালা তো শেষ। বংশপ্রদীপটা জ্বালাইতে পারলাম বইলা বড় খুশি।’
এভাবে শুধু ওই দম্পতি নয়, সিলেট অঞ্চলে এইচআইভি আক্রান্ত ২৩ দম্পতির ঘরে ২৪ সন্তানের জন্ম হয়েছে। পরীক্ষায় যাদের শরীরে এইচআইভি সংক্রমণ মেলেনি। চিকিৎসায় এইচআইভি-পজিটিভ আক্রান্তরাও যে স্বাভাবিক দাম্পত্যজীবন করতে পারছেন, তার অনন্য উদাহরণ হয়ে উঠেছে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ইউনিসেফের সহায়তায় পরিচালিত ‘মা হতে শিশুর শরীরে এইচআইভি সংক্রমণ প্রতিরোধ কার্যক্রম (পিএমটিসিটি) প্রকল্প’।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, ২০১৩ সালের অক্টোবর থেকে সিলেট বিভাগের চার জেলায় এ প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। প্রথম বছর এইচআইভি আক্রান্ত চার দম্পতিকে চিকিৎসাধীন রাখা হয়। ২০১৪ সালের আগস্টের দিকে চার সন্তান জন্ম হলে তাদের শরীরে এইচআইভির সংক্রমণ না পাওয়ার সফলতার মধ্য দিয়ে শুরু হয় এ প্রকল্পের কার্যক্রম।
ওসমানী হাসপাতালে পিএমটিসিটি কার্যক্রম পরিচালনার দপ্তরে সংরক্ষিত রয়েছে এইচআইভি আক্রান্ত ২৬ দম্পতির তথ্য-উপাত্ত। সেই সঙ্গে এইচআইভি-এইডস রোগীদের পরিসংখ্যান। গত ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সিলেট বিভাগের চার জেলায় এইচআইভি-এইডস আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৭৮০ জন। এর মধ্যে ৩৯টি শিশু রয়েছে।
পিএমটিসিটি-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, এইচআইভি-এইডস ছড়ায় মূলত তিনটি কারণে। একটি রক্তের আদান-প্রদান, দ্বিতীয়টি অরক্ষিত যৌনমিলন, তৃতীয়টি সন্তান জন্মদানে। প্রতিরোধ করতে হলে প্রথম দুটির ক্ষেত্রে শুধু সচেতনতা আর তৃতীয়টির ক্ষেত্রে রয়েছে চিকিৎসা। একজন এইচআইভি আক্রান্ত মায়ের সুস্থ সন্তানের জন্য তিনটি ধাপে চলে চিকিৎসা। গর্ভাবস্থায়, সন্তান ভূমিষ্ঠ ও মায়ের দুধ পানকালে এক বছর। এইচআইভি-এইডস আক্রান্ত মায়েদের সুস্থ সন্তান জন্মদানের চিকিৎসাপদ্ধতি হচ্ছে এইচআইভি সংক্রমণ প্রতিরোধ টিকা। গর্ভধারণের আগে একটি, গর্ভাবস্থায় একটি ও প্রসবকালীন আরেকটি টিকা দেওয়ার পর সংক্রমণমুক্ত সন্তান জন্মদানের সম্ভাবনা দেখা দেয়। সন্তান প্রসবের পর নবজাতকের প্রথম পরীক্ষায় এইচআইভি-নেগেটিভ অর্থাৎ ‘না’ এলে সন্তানকে সুস্থ ঘোষণা করা হয়।
কথা হয় সিলেটের প্রবাসী অধ্যুষিত এলাকার এক গৃহিণীর সঙ্গে। প্রথম সন্তানের মা হবেন তিনি। আক্রান্ত হওয়ার কাহিনি শুনে জানা গেল, নিতান্তই তাঁর অজানার মধ্যে ঘটেছে। স্বামী বিদেশ থেকে এসেছেন বলে তড়িঘড়ি করে বিয়ে হয়। বিয়ের তিন মাস পর সন্তান নিতে গাইনি বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হলে পরীক্ষায় মেলে শরীরে এইচআইভির সংক্রমণ। শেষে স্বামীর শরীরে পাওয়া যায় এইচআইভি-পজিটিভ। প্রায় এক বছর বিরতি দিয়ে সন্তানসম্ভবা হন তিনি। সুস্থ সন্তানের অপেক্ষায় থাকা ওই নারীর কথায় বেশ দৃঢ়তার সুর। বললেন, ‘স্বামীর অজ্ঞাতেই রোগটি তাঁর শরীরে বাসা বেঁধেছিল। সেখান থেকে আমিও আক্রান্ত হই। এখন দুজনই মেনে নিয়েছি, সুস্থ সন্তান হলেই আমরা আনন্দের সঙ্গে এ জীবন পার করে দিতে পারব।’ এ রকম দৃঢ়তার মূলে চিকিৎসা কার্যক্রমের সফলতা বলে জানালেন পিএমটিসিটি সিলেটের প্রোগ্রাম ম্যানেজার মোতাহের হোসেন। গত বুধবার ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পিএমটিসিটি দপ্তরে বসে আলাপকালে তিনি বলেন, ‘আমরা আক্রান্ত মায়ের এই চিকিৎসাপদ্ধতিতে গত তিন বছরে ২৩ শিশুর সুস্থ জীবন দিতে সক্ষম হয়েছি। তা দেখে ২৬ দম্পতির মধ্যে এ রকম দৃঢ়তা এসেছে। এতে করে তাঁদের মধ্যে আগের চেয়ে জীবনীশক্তি বৃদ্ধিও লক্ষণীয় হয়ে উঠেছে।’
ইউনিসেফের সহায়তায় পিএমটিসিটির এ কার্যক্রম এইচআইভি-এইডস ঝুঁকি বিবেচনায় বাংলাদেশের মধ্যে কেবল ঢাকা, সিলেট ও চট্টগ্রামে পরীক্ষামূলকভাবে চলছে বলে জানান ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আবদুস ছবুর মিঞা।